বেরলিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে প্রদর্শিত ‘কুইন এট সি’ চলচ্চিত্রটি ডিমেনশিয়া রোগে আক্রান্ত বৃদ্ধের যত্নে জড়িত তিন প্রজন্মের নারীর জটিল সম্পর্ককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ল্যান্স হ্যামার, যিনি ২০০৮ সালের ‘ব্যালাস্ট’ পর থেকে প্রথম দিকের পরিচালনা কাজ করছেন, এই ছবির দায়িত্বে আছেন। প্রধান ভূমিকায় জুলিয়েট বিনোচ, অ্যানা কাল্ডার-মারশাল এবং ফ্লোরেন্স হান্ট অভিনয় করেছেন, আর টম কোর্টনি সহ অন্যান্য অভিনেতাও অংশগ্রহণ করেছেন।
চিত্রটি লন্ডনের টাফনেল পার্কে অবস্থিত একটি পুরনো টাউনহাউসে শুট করা হয়েছে, যেখানে বৃদ্ধ দম্পতির বাসস্থান এবং তাদের কন্যা-নাতনির দৈনন্দিন জীবনকে সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। হ্যামার সামাজিক সেবা ও পুলিশিং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে, এমনকি কিছু বিশেষজ্ঞকে কাল্পনিক চরিত্রে রূপান্তরিত করে বাস্তবতার স্তর বাড়িয়েছেন। এই পদ্ধতি ছবির প্রযুক্তিগত ও আবেগগত সত্যতা উভয়ই শক্তিশালী করেছে।
‘কুইন এট সি’ তে তিন প্রজন্মের নারীর সম্পর্ক—বৃদ্ধা লেসলি (অ্যানা কাল্ডার-মারশাল), তার কন্যা (জুলিয়েট বিনোচ) এবং নাতনি (ফ্লোরেন্স হান্ট)—একটি জটিল পারিবারিক গাঁথা গড়ে তোলে, যেখানে ডিমেনশিয়ার ফলে সৃষ্ট স্মৃতির ফাঁক এবং যত্নের ভারসাম্যকে সূক্ষ্মভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। ছবির টোন সরাসরি ও অনুকম্পাহীন, যা দর্শকের কাছে বিষয়টির কঠোর বাস্তবতা প্রকাশ করে।
চিত্রের দৃশ্যাবলী লন্ডনের উচ্চমূল্য সম্পত্তি বাজারের প্রতিফলন ঘটায়; টাউনহাউসের ঠিকানা এমন একটি এলাকা যেখানে একসময় মধ্যবিত্ত পরিবার বসবাস করত, আর এখন সম্পত্তির দাম অগণিত গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পটভূমি চরিত্রগুলোর সামাজিক অবস্থান ও অতীতের স্মৃতিকে জোরালোভাবে তুলে ধরে।
যুবতীর বন্ধুদের পাফার জ্যাকেট এবং তাদের ব্যবহৃত স্ল্যাং ছবিতে আধুনিক তরুণ সংস্কৃতির স্বাদ যোগ করে, যা প্রজন্মের পার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করে। হ্যামার এই বিবরণগুলোকে যত্নসহকারে সাজিয়ে, লন্ডনের শহুরে জীবনের সূক্ষ্ম দিকগুলোকে বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করেছেন।
চিত্রের সময়কাল প্রায় দুই ঘণ্টা, মোট দৈর্ঘ্য এক ঘণ্টা ছাব্বই মিনিট। এই সময়ের মধ্যে গল্পটি ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়, যেখানে প্রতিটি দৃশ্যের মধ্যে চরিত্রের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ও স্নেহের মুহূর্তগুলোকে সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
‘কুইন এট সি’ তে কিছু চরিত্রের নামের বানান নিয়ে স্থানীয় ভাষাগত পার্থক্য উল্লেখযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ, লেসলি নামের বানান সাধারণত ব্রিটিশ ইংরেজিতে “লেসলি” হিসেবে দেখা যায়, তবে ছবিতে “লেসলি” হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা কিছু দর্শকের দৃষ্টিতে অস্বাভাবিক হতে পারে।
চিত্রটি দর্শকের জন্য সহজে উপভোগ্য না হলেও, তার আন্তরিকতা ও তীব্রতা প্রশংসনীয়। ডিমেনশিয়া রোগের সঙ্গে যুক্ত মানসিক ও শারীরিক চ্যালেঞ্জগুলোকে সরাসরি উপস্থাপন করে, এটি একটি সামাজিক বার্তা বহন করে যে যত্নের ক্ষেত্রে ভালোবাসা একা যথেষ্ট নয়।
বেরলিন উৎসবে এই ছবির অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, যেখানে হ্যামারের প্রথম দিকের পরিচালনা কাজ হিসেবে এটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। তার পূর্বের কাজ ‘ব্যালাস্ট’ থেকে দীর্ঘ বিরতির পর এই নতুন চিত্রটি তার সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির পুনরায় উন্মোচন হিসেবে বিবেচিত।
চিত্রের সাউন্ডট্র্যাক ও সাউন্ড ডিজাইনও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যা দৃশ্যের আবেগময় তীব্রতাকে বাড়িয়ে দেয়। সামাজিক সেবা ও পুলিশিং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে তৈরি দৃশ্যগুলোতে প্রয়োজনীয় তথ্য ও বাস্তবিক দিকগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা ছবির শিক্ষামূলক দিককে সমৃদ্ধ করে।
সামগ্রিকভাবে, ‘কুইন এট সি’ একটি বাস্তববাদী, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে ডিমেনশিয়া রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবারিক জীবনের চিত্রায়ন করে। যদিও এটি বিনোদনমূলক দিক থেকে হালকা না, তবু তার সত্যিকারের উপস্থাপনা ও মানবিক গভীরতা দর্শকদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।
চলচ্চিত্রের শেষাংশে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে: যত্নের পথে প্রেমের পাশাপাশি পেশাগত সহায়তা ও সামাজিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। এই বার্তাটি ছবির মূল থিমকে সমর্থন করে এবং দর্শকদেরকে রোগের প্রতি সচেতনতা বাড়াতে উৎসাহিত করে।



