মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের পর নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ড. মোহাম্মদ মুইজ্জু একত্রিত হন। দু’জন নেতার সাক্ষাৎকার ঢাকা শহরের একটি সরকারি হলের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উভয় দেশের কূটনৈতিক মিশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী করা এবং শাসনকালের সহযোগিতা ক্ষেত্রগুলো নির্ধারণ করা।
বৈঠকে ড. মুইজ্জু ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপির জয়কে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি এই ফলাফলকে দু’দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন। শুভেচ্ছা বার্তা বাংলা ও ধিবেহি উভয় ভাষায় উপস্থাপিত হয়, যা সাংস্কৃতিক সংযোগের গুরুত্বকে তুলে ধরে। এছাড়া তিনি ভবিষ্যতে দু’দেশের রাজনৈতিক সংলাপকে নিয়মিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
মালদ্বীপ সরকার দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে, এবং বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। তিনি উল্লেখ করেন, দু’দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংযোগকে নতুন মাত্রা দিতে পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে একটি যৌথ কমিশন গঠন করে নিয়মিত বৈঠক করার প্রস্তাবও করা হয়। উভয় পক্ষই এই কাঠামোকে দ্বিপাক্ষিক প্রকল্পের ত্বরান্বিত বাস্তবায়নের মূল হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, এই সাক্ষাৎকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি এই প্রথম সরকারি সফরে বাংলাদেশে এসেছেন, যা দু’দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা নির্দেশ করে। রাষ্ট্রপতির সফরকে দু’দেশের কূটনৈতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মুহূর্তে দু’দেশের মিডিয়া ও নাগরিক সমাজের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করার জন্য দু’নেতা বিস্তৃত আলোচনায় লিপ্ত হন। উভয় পক্ষই বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য, বিশেষত টেক্সটাইল ও কৃষি পণ্য, এবং মালদ্বীপের পর্যটন সেবা বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে মত বিনিময় করেন। পারস্পরিক বিনিয়োগের সুযোগ সনাক্ত করার জন্য একটি বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করার পরিকল্পনা করা হয়। এছাড়া দু’দেশের ব্যবসায়িক মণ্ডলীর মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের জন্য বাণিজ্য মিশন আয়োজনের প্রস্তাবও উঠে আসে।
স্বাস্থ্য সহযোগিতার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। দু’দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে একত্রে কাজ করার মাধ্যমে মহামারী প্রস্তুতি, টিকাদান প্রোগ্রাম এবং চিকিৎসা প্রযুক্তি স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হবে বলে সম্মত হয়। একটি যৌথ স্বাস্থ্য টাস্ক ফোর্স গঠন করে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যসেবা মানোন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়। উভয় দেশই স্বাস্থ্য কর্মী প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় সহযোগিতা বাড়াতে চায়। এই উদ্যোগগুলোকে দু’দেশের জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হয়।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য যৌথ উদ্যোগের প্রস্তাবও উত্থাপিত হয়। মালদ্বীপ সরকার সমুদ্রপৃষ্ঠের উত্থান ও টেকসই পর্যটন উন্নয়নে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে ইচ্ছুক বলে জানান। দু’দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয় একসাথে কাজ করে সমুদ্র সংরক্ষণ, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি এবং সবুজ অবকাঠামো প্রকল্পে সহযোগিতা করবে। এই আলোচনাকে দু’দেশের আন্তর্জাতিক পরিবেশ নীতির সমন্বয় হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।
উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে দু’দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম এবং গবেষণা প্রকল্প চালু করার পরিকল্পনা করা হয়। পাশাপাশি, উভয় দেশের এয়ারলাইন সংস্থার মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট সংযোগ স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকে সহজতর করতে ভিসা প্রক্রিয়ার স্বয়ংক্রিয়তা নিয়ে সম্মত হয়। স্কলারশিপ ও ফ্যাকাল্টি বিনিময় প্রোগ্রামকে দু’দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মালদ্বীপ সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই বৈঠককে দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছে। ড. মুইজ্জু উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে মালদ্বীপের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বাড়ানো সম্ভব হবে। তিনি মালদ্বীপের পর্যটন ও মাছ ধরা শিল্পকে বাংলাদেশের বাজারে প্রসারিত করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। এই লক্ষ্যকে অর্জনের জন্য দু’দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সমন্বিত নীতি তৈরি করবে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে, দু’দেশের সহযোগিতা কেবল বাণিজ্যিক নয়, নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও স্মারক চিঠি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে। বাংলাদেশ সরকার ভিসা সহজীকরণ, কাস্টমস প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগের আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা প্রকাশ করে। এই নীতিগুলোকে দু’দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করার মূল উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়।
বৈঠকের পরপরই দু’দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোকে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে বিনিয়োগ ফোরাম, স্বাস্থ্য সেমিনার এবং একাডেমিক সিম্পোজিয়ামের আয়োজন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই উদ্যোগগুলোকে দু’দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। পরিকল্পিত মীমাংসা ও সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের সময়সীমা শীঘ্রই নির্ধারিত হবে।
সারসংক্ষেপে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ড. মুইজ্জুর এই প্রথম সরকারি সাক্ষাৎ দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন গতিতে নিয়ে যাওয়ার সূচনা চিহ্নিত করে। উভয় সরকারই পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও কাঠামো গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। এই পদক্ষেপকে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারতীয় মহাসাগরের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।



