বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আজ রাজধানীর অফিসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের স্পনসর, পরিচালক এবং প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার বিক্রি থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে লক‑ইন সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এই পদক্ষেপটি কোম্পানির প্রাথমিক পাবলিক অফারিং (আইপিও) তহবিলের ব্যবহার এবং সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় অসঙ্গতি প্রকাশের পর নেওয়া হয়েছে।
বিএসইসির ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ২০২২ সালে আইপিও মাধ্যমে ৯৫ কোটি টাকা তহবিল সংগ্রহের অনুমোদন পেয়েছিল। আইপিও প্রস্পেক্টাসে তহবিলের ব্যবহার ব্যবসা সম্প্রসারণ, যন্ত্রপাতি ক্রয় ও ইনস্টলেশন, কারখানা ভবন নির্মাণ, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ এবং আইপিও সংক্রান্ত ব্যয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে, কোম্পানি এখনও আইপিও তহবিলের সম্পূর্ণ ব্যবহার সম্পন্ন করতে পারেনি। ঘোষিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে অগ্রগতি না থাকায় তহবিলের ব্যয় পরিকল্পনা থেকে বিচ্যুতি দেখা দেয়। এই বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারিতে আসে।
সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৫ তারিখে কোম্পানি মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) প্রকাশ করে ৩২ তলা উচ্চতার একটি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা জানায়। এই ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভবনটি রিয়েল এস্টেট ও হোটেল ব্যবসা চালু করার উদ্দেশ্যে তৈরি হবে। তবে, প্রকল্পের কোনো যথাযথ মূল্যায়ন, বাস্তবায়নযোগ্যতা সমীক্ষা বা নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ছাড়াই এই পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়।
বিএসইসি জানায়, ৩২ তলা ভবনের জন্য রা.জু.কে. (রাজউক) এর বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন এবং পরিবেশগত অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন পাওয়া যায়নি। তদুপরি, কোম্পানির পূর্বে এমন বড় আকারের নির্মাণ প্রকল্পে কোনো অভিজ্ঞতা বা প্রযুক্তিগত দক্ষতা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোম্পানির সংবিধানিক উদ্দেশ্যও এই ধরনের রিয়েল এস্টেট বা হোটেল ব্যবসার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংবিধানে মূলত ল্যাবরেটরি ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের উন্নয়নকে কেন্দ্র করে কাজ করার কথা বলা হয়েছে, ফলে নতুন প্রকল্পটি সংস্থার মৌলিক উদ্দেশ্যের থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
এই বিষয়গুলো যাচাই করতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ) একটি বিশেষ পরিদর্শন পরিচালনা করে। পরিদর্শন প্রতিবেদনে একই ধরনের অসঙ্গতি ও তহবিল ব্যবহার সংক্রান্ত লঙ্ঘন উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোম্পানি আইপিওতে ঘোষিত লক্ষ্যগুলো পূরণে ব্যর্থ হয়েছে এবং নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা যথাযথ ভিত্তি ছাড়া করা হয়েছে।
পরিদর্শনের ফলাফল এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশের ভিত্তিতে, বিএসইসি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লক‑ইন সময় বাড়িয়ে শেয়ার বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করা লক্ষ্য করা হয়েছে।
বাজারে এই নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের ফলে আশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজের শেয়ারের মূল্য সাময়িকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিনিয়োগকারীরা তহবিলের অপব্যবহার এবং প্রকল্পের অপ্রতিষ্ঠিত প্রকৃতি নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছে। শেয়ার লক‑ইন সময় বাড়ার ফলে স্বল্পমেয়াদে লিকুইডিটি কমে যাবে, যা ট্রেডিং ভলিউমে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, যদি কোম্পানি তহবিলের ব্যবহার স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে এবং প্রকল্পের বাস্তবায়নযোগ্যতা নিশ্চিত করে, তবে শেয়ারহোল্ডারদের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব। অন্যদিকে, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক হস্তক্ষেপ এবং প্রকল্পের পুনর্বিবেচনা না করা হলে শেয়ার মূল্যের দীর্ঘমেয়াদী পতন ঘটতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, বিএসইসির এই পদক্ষেপটি বাজারের স্বচ্ছতা ও শেয়ারহোল্ডার সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। তবে, আশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজের জন্য এখনো তহবিলের সঠিক ব্যবহার, প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং সংস্থার মূল ব্যবসার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার দায়িত্ব রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি এবং কোম্পানির স্বচ্ছতা বজায় থাকলে শেয়ার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।



