ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনের পর বাংলাদেশ সরকার নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেছে। ৪৯ সদস্যের এই মন্ত্রিসভায় ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত। টেকনোক্র্যাট কোটায় দুইজন পূর্ণ মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ পাওয়া গেছে, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বিশেষ মনোযোগের বিষয়।
মন্ত্রিসভার মোট ৪৯ সদস্যের মধ্যে টেকনোক্র্যাট কোটার অংশীদারিত্ব সীমিত, তবে এই কোটায় নির্বাচিত তিনজনের পেশাগত পটভূমি সরকারকে বিশেষজ্ঞ দৃষ্টিকোণ থেকে নীতি নির্ধারণে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। পূর্ণ মন্ত্রী পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন এবং ড. খলিলুর রহমান। প্রতিমন্ত্রী পদে দায়িত্ব পেয়েছেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক।
হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিন বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য এবং কুমিল্লা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি কুমিল্লা-৬ সদর আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রার্থী ছিলেন, তবে দলীয় মনোনয়ন পাননি। পরবর্তীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও ১৯ জানুয়ারি তারিখে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেন। তার রাজনৈতিক যাত্রা ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৯ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে শুরু হয়; তবে ২০০৮ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে কুমিল্লা-৬ আসন থেকে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে পরাজিত হন।
ড. খলিলুর রহমানের ক্যারিয়ার সরকারি সেবায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে গড়ে উঠেছে। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে নিযুক্ত হন। পরে তাকে পুনরায় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদে স্থাপন করা হয়। ড. রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে, এবং ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগদান করেন।
অধিনায়ক আমিনুল হক, যিনি জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক ক্যাপ্টেন, রাজনৈতিক মঞ্চে নতুন ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। তিনি ঢাকা-১৬ আসন থেকে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন, তবে ভোটে পরাজিত হন। তার মতো কোনো সাবেক ক্রীড়াবিদের নির্বাচনে পরাজয় ও টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হওয়া বাংলাদেশে খুব কমই দেখা যায়। স্বাধীনতার পর প্রথম মন্ত্রিত্ব পান সাবেক ফুটবলার মেজর হাফিজ, আর পরে আরিফ খান জয় ক্রীড়া উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আমিনুল হক তৃতীয় সাবেক ফুটবলার হিসেবে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়ায় রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ হয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে টেকনোক্র্যাট কোটার এই তিনজন মন্ত্রী তাদের পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে নীতি প্রণয়নে বিশেষ অবদান রাখতে পারেন। তবে কিছু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন যে, টেকনো-প্রফেশনালদের রাজনৈতিক জ্ঞান ও পার্টি সমর্থন ছাড়া নীতি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি তার পেশাগত দক্ষতা ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে ভিত্তি করে সরকারে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের চেয়ে নীতিগত দিককে অগ্রাধিকার দেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, হযি আমিনুর রশীদ ইয়াছিন ও ড. খলিলুর রহমানের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা, এবং আমিনুল হকের ক্রীড়া ও যুব উন্নয়ন সংক্রান্ত জ্ঞান সরকারকে বহুমুখী দৃষ্টিকোণ প্রদান করবে।
ভবিষ্যতে এই তিনজনের ভূমিকা কীভাবে গড়ে উঠবে, তা দেশের নীতি দিকনির্দেশনা ও জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। সরকার যদি তাদের বিশেষজ্ঞতা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে টেকনোক্র্যাট কোটার এই সংযোজন নীতি বাস্তবায়নে নতুন গতিপথ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, পার্টি সমর্থন ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের অভাব হলে মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে। তাই, টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের পারফরম্যান্স এবং তাদের নীতি প্রভাবের পর্যবেক্ষণ আগামী মাসে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।



