কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প-৫-এ গতকাল রাত প্রায় ৩ টার দিকে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। আগুনের সূত্রপাত ব্লক ই-৫ এলাকার এক ঝুপড়ি থেকে শুরু হয়ে দ্রুত ছড়িয়ে ৩৫টি তামিল কাঠের ঘরকে পুড়িয়ে দেয়। কোনো প্রাণহানি রিপোর্ট করা হয়নি, তবে শিকড়ে ক্ষতি ও সম্পদের ক্ষয় উল্লেখযোগ্য।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই ক্যাম্পের নিকটবর্তী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সিনিয়র স্টেশন অফিসার দোলন আচার্য্য ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর নির্দেশ দেন। উখিয়া ফায়ার স্টেশনের তিনটি ইউনিট এবং স্যাটেলাইট ফায়ার স্টেশনের একটি ইউনিট মোট চারটি ইউনিট দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছায় এবং রাতের অল্প সময়ের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রায় ভোর ৪ টায় অগ্নি ধীর হয়ে যায় এবং ৫ টার দিকে সম্পূর্ণভাবে নিভে যায়।
ফায়ার সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী পুড়িয়ে যাওয়া ৩৫টি ঝুপড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে, যার আনুমানিক ক্ষতি প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। তদুপরি, তৎকালীন তীব্র উদ্ধার কাজের মাধ্যমে প্রায় পনেরো লাখ টাকার মূল্যমানের সামগ্রী নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এই পরিমাণে সঞ্চিত সামগ্রীতে খাবার, গৃহস্থালি সামগ্রী এবং মৌলিক চিকিৎসা সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই ঘটনার আগে মাত্র এক মাসের মধ্যে, ১৯ জানুয়ারি রাত প্রায় সাড়ে তিনটায় উখিয়ার ১৬ নম্বর শফিউল্লাহ কাটা ক্যাম্পে বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সেই সময়ে শরণার্থীদের ৪৪৮টি ঝুপড়ি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ১৬টি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। উভয় ঘটনার সময় ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত সাড়া এবং সমন্বিত কাজের ফলে প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব হয়েছে, তবে কাঠামোগত ক্ষতি ও মানবিক প্রভাব উল্লেখযোগ্য রয়ে গেছে।
ক্যাম্পের কিছু রোহিঙ্গা বাসিন্দা জানান, শরণার্থী ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘন ঘন ঘটছে এবং প্রতিবারই তাদের জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। তারা উল্লেখ করেন, ঘন ঘন আগুনের কারণ হিসেবে অস্থায়ী কাঠামোর নিকটস্থ গ্যাস সিলিন্ডার, অপ্রতুল বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং অগোছালো জ্বালানি সংরক্ষণকে উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনার পর একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত তদারকি ও জরুরি সেবা শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তা আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী বজায় রাখা হবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো হবে।
জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) ক্যাম্পে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানায়। সংস্থা উল্লেখ করে, অস্থায়ী শরণার্থী ক্যাম্পে কাঠামোগত নিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক সংযোগের মানদণ্ড এবং অগ্নি প্রশমন সরঞ্জামের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া, ক্যাম্পের বাসিন্দাদের অগ্নি প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করাও প্রয়োজনীয় বলে সংস্থা জোর দেয়।
অঞ্চলীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক রাহুল চৌধুরী বলেন, উখিয়ার শরণার্থী ক্যাম্পে বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা শুধু মানবিক সংকট নয়, বরং বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক চিত্রের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। তিনি উল্লেখ করেন, মিয়ানমার থেকে আসা শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান না হলে ক্যাম্পের অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ বাড়বে।
এই প্রেক্ষাপটে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য টেকসই সমাধান গড়ে তোলার পাশাপাশি ক্যাম্পের নিরাপত্তা মানদণ্ড উন্নয়নে সহায়তা করা জরুরি। মানবিক সংস্থা ও উন্নয়ন পার্টনারদের সমন্বিত প্রচেষ্টা ক্যাম্পের অগ্নি নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা সুবিধা বাড়াতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে শরণার্থীদের আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধি করবে।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সংস্থা একত্রে ক্যাম্পের অগ্নি প্রতিরোধ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ক্যাম্পের অগ্নি নির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি শেল্টার এবং নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হবে বলে জানানো হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো শরণার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সহায়ক হবে।
উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘটিত অগ্নিকাণ্ডের ফলে মানবিক সহায়তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা, বাংলাদেশ সরকার এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মূল ভূমিকা পালন করবে, যাতে শরণার্থীরা নিরাপদ ও গ dignified পরিবেশে বসবাস করতে পারে।



