বিএনপি নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় প্রক্রিয়াগত জটিলতা দেখা দিয়েছে। এই ঘটনা ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই ঘটেছে, যেখানে ভোটাররা শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিয়েছেন এবং ফলাফলকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে জুলাই ২০২৫ সংবিধান সংস্কার রেফারেন্ডে “হ্যাঁ” ভোটের অধিকাংশে জয়লাভের মাধ্যমে জনগণ সংশোধনীকে অনুমোদন করেছে।
১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। ভোটাররা ভোট দিতে পেরেছেন, প্রার্থীরা ফলাফল গ্রহণ করেছেন এবং গণভোটে “হ্যাঁ” ভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে জনমত প্রকাশ করেছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণার পর সকল নির্বাচিত প্রার্থী শপথ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন।
সংবিধানের ধারা ৭(১) অনুসারে, “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ” এবং এই সার্বভৌম ক্ষমতার স্বীকৃতিতে রেফারেন্ডের আদেশ জারি করা হয়। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর ধারা ৩-এ উল্লেখ আছে যে, রেফারেন্ডের ফলাফল অনুযায়ী সংশোধনী অংশ গণভোটে উপস্থাপন করা হবে। “হ্যাঁ” ভোটের মাধ্যমে জনগণ এই আদেশকে অনুমোদন করেছে।
আদেশের ধারা ৮-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, নির্বাচিত প্রতিনিধি জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পর একই শপথ অনুষ্ঠানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন এবং সংশ্লিষ্ট শপথপত্রে স্বাক্ষর করবেন। এই ধারা অনুসারে শপথের দ্বৈততা নিশ্চিত করা হয়, যাতে সংশোধনী প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
বিএনপি নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জাতীয় সংসদ সদস্যের শপথ গ্রহণের পরেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। ফলে শপথ না নেওয়ার ফলে প্রয়োজনীয় তফসিল-১ অনুযায়ী পরিষদের গঠন সম্পন্ন হয়নি এবং আইনগতভাবে সংশোধনী প্রক্রিয়া অগ্রসর হতে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
বদিউল আলম মজুমদার, যিনি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ছিলেন, উল্লেখ করেছেন যে, এই জটিলতা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, দেশটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তাই রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি।
বিএনপি পক্ষের মতে, শপথের শর্তাবলী এবং প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে, যা তাদের শপথ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করেছে। তারা দাবি করে যে, পরিষদের শপথের সময়সূচি ও পদ্ধতি সম্পর্কে যথাযথ ব্যাখ্যা না পাওয়ায় তারা সতর্কতা অবলম্বন করেছে। তবে সরকারী সূত্রে এই উদ্বেগের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়নি।
জুলাই মাসে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় এক হাজার চারশো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজারো মানুষ আহত হয়েছেন। এই ঘটনায় স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের জন্য বহু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের লক্ষ্যে আত্মত্যাগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে, রেফারেন্ডের ফলাফলের ভিত্তিতে সংস্কার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
শপথ না নেওয়ার ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের গঠন বিলম্বিত হয়েছে, যা সংশোধনী আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করার সময়সূচিকে প্রভাবিত করতে পারে। আইনগতভাবে পরিষদের পূর্ণাঙ্গ গঠন না হলে সংশোধনী প্রকল্পের কার্যকরী ধাপগুলোতে বাধা সৃষ্টি হতে পারে এবং সম্ভবত আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।
পরবর্তী সময়ে জাতীয় সংসদে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। শপথের বিষয়টি সমাধান না হলে সরকারী পরিকল্পনা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার কার্যক্রমে দেরি হতে পারে, যা দেশের উন্নয়নমূলক প্রকল্প ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিগুলোর উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও দ্রুত সমাধান প্রয়োজন, যাতে সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া রেফারেন্ডের ফলাফলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অগ্রসর হয় এবং দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি নিশ্চিত হয়।



