ঝাঁঝগির-চম্পা জেলার দারদেই গ্রামে সোমবার সকালে স্থানীয় পুলিশকে প্রতিবেশীদের জানানো হয় যে, কৃষ্ণ প্যাটেল (৪৮) ও রমা বাই (৪৭) নামের দম্পতি নিজেদের বাড়ির উঠোনে ঝুলে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। দুজনের দেহ একটি নিম গাছের ডালের ওপর লটকিয়ে ছিল, যা গ্রামবাসীদের মধ্যে শক সৃষ্টি করেছে।
পুলিশের মতে, মৃতদেহগুলোকে স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও ফরেনসিক দল দ্রুত উদ্ধার করে মৃতদেহ পরীক্ষা চালায়। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, দম্পতি আত্মহত্যা করেছেন এবং তাদের সঙ্গে একটি লিখিত নোটও পাওয়া গেছে। নোটে তাদের শোক ও আত্মত্যাগের কারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ছিল।
কৃষ্ণ প্যাটেল গ্রামে রাজমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন এবং রমা বাই গৃহিণী ছিলেন। দুজনের একমাত্র সন্তান আদিত্য প্যাটেল, ২১ বছর বয়সী, ২০২৪ সালে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। আদিত্যকে পরিবারে ‘অস্তিত্বের ভিত্তি’ ও ‘সম্পূর্ণ পৃথিবী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তার মৃত্যু পরিবারের মানসিক ভারকে অতি বেশি বাড়িয়ে দেয়।
আদিত্যর মৃত্যুর পর পরিবারটি গভীর শোকের মধ্যে ডুবে যায়। নোটে কৃষ্ণ প্যাটেল উল্লেখ করেন, আদিত্যকে তিনি ‘ঈশ্বরের আশীর্বাদ’ হিসেবে দেখতেন এবং তার অনুপস্থিতি তাদের জীবনে শূন্যতা তৈরি করেছে। আদিত্যকে বন্ধু ও সন্তান উভয়ই হিসেবে বর্ণনা করে তিনি তার অনুপস্থিতি বর্ণনা করেন।
নোটে আরও উল্লেখ আছে যে, আদিত্য মারা যাওয়ার দিন স্থানীয় মন্দিরে পুজোর জন্য পুরোহিতের সহকারী দরকার ছিল, তাই কৃষ্ণ প্যাটেল রমা বাইকে জানান। রমা বাই তৎক্ষণাৎ সম্মতি দেন এবং কাজটি সম্পন্ন করেন। তবে আদিত্যকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তের পরই দুর্ঘটনা ঘটে; একটি ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
কৃষ্ণ প্যাটেল নোটে এই সিদ্ধান্তকে ‘জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, “আদিত্য আমাকে চিরতরে ছেড়ে চলে গেছে। আমরা বেঁচে ছিলাম ঠিকই, কিন্তু জীবন ছিল না।” শোকের অশ্রুতে তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
রাহুদ পুলিশ স্টেশনের ইনচার্জ সত্যম চৌহান জানান, গত রোববার রাত গভীর সময় দম্পতি আত্মহত্যার পরিকল্পনা করেন এবং তা কার্যকর করেন। নোটে স্পষ্টভাবে লেখা আছে যে, একমাত্র সন্তান হারানোর শোক সামলাতে না পেরে তারা এই চরম সিদ্ধান্ত নেয়।
গ্রামবাসীরা জানান, গত এক বছর ধরে দম্পতি সামাজিক মেলামেশা থেকে দূরে ছিলেন। তারা হাসি-খুশি কম দেখাতেন, কথাবার্তা কম বলতেন এবং অধিকাংশ সময়ই আদিত্যকে নিয়ে কথা বলতেন। এই বিচ্ছিন্নতা তাদের মানসিক অবস্থা আরও খারাপ করে তুলেছিল।
নোটে দম্পতি স্বেচ্ছায় এবং সচেতনভাবে নিজেদের ‘ভগবান শিবের চরণে অর্পণ’ করছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তারা কোনো দায়িত্বশীলকে দোষারোপ না করে, নিজেরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। এছাড়া তারা গ্রামবাসীদের অনুরোধ করেন, “আমাদের জন্য শোক করবেন না, হাসি মুখে বিদায় দিন। আমরা পূর্ণ শান্তিতে এই পৃথিবী ছেড়ে যাচ্ছি।”
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে নোট ও মৃতদেহ সংগ্রহ করে ফরেনসিক বিশ্লেষণ চালাচ্ছে। আত্মহত্যা হিসেবে মামলা রেজিস্টার করা হয়েছে এবং তদন্তের অংশ হিসেবে নোটের সত্যতা, মৃতদেহের অবস্থান ও কোনো অপরাধের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।
আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মহত্যা ভারতীয় দণ্ডসংহিতার ধারা ১১৫(১) অনুসারে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় না, তবে আত্মহত্যা প্রচার বা সহায়তা করা হলে আইনি শাস্তি হতে পারে। বর্তমান মামলায় কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপের সন্দেহ না থাকায়, তদন্ত প্রধানত আত্মহত্যার কারণ ও মানসিক অবস্থা যাচাইয়ের দিকে মনোনিবেশ করবে।
এই দুঃখজনক ঘটনার পর গ্রামবাসীরা শোকের সাথে সাথে দম্পতির শেষ ইচ্ছা মেনে, তাদের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে প্রস্তুত। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশও পরিবারকে মানসিক সহায়তা প্রদান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।



