এমানুয়েল ম্যাক্রন আজ মুম্বাইয়ে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন, যা তার তিন দিনের ভারত সফরের প্রথম দিন। সফরের মূল লক্ষ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানো এবং ফরাসি ড্যাসো রাফেল ফাইটার জেটের বৃহৎ ক্রয় চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা। দুই দেশের শীর্ষ নেতার এই বৈঠক দুই দেশের কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ককে নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলেছে।
ম্যাক্রন মুম্বাইয়ে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি তার “প্রিয় বন্ধু” হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে একটি বার্তা প্রকাশ করেন। মোদি তার স্ত্রী ব্রিজিটের সঙ্গে আর্থিক রাজধানী মুম্বাইতে সফর শুরু করার পর এই বার্তা দিয়ে দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে “নতুন উচ্চতায়” নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। বিকালের দিকে দুজন নেতার বৈঠক নির্ধারিত, যেখানে রাফেল জেটের অতিরিক্ত অর্ডারসহ অন্যান্য বিষয় আলোচিত হবে।
ফরাসি সরকার ১১৪টি অতিরিক্ত রাফেল জেটের সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে চায়, যা মোট প্রায় ৩০ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের হতে পারে। এই চুক্তি সম্পন্ন হলে এটি ফ্রান্সের জন্য এশিয়ায় সবচেয়ে বড় সামরিক বিক্রয় হিসেবে বিবেচিত হবে। রাফেল জেটের ক্রয় ভারতকে রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য সরবরাহকারী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
ম্যাক্রন তার চতুর্থ ভারত সফর শুরু করেন, যেখানে তিনি ২০০৮ সালের মুম্বাই সন্ত্রাসী হামলার শিকারদের স্মরণে একটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন। এছাড়া তিনি বলিউডের শাবানা আজমি ও মনোজ বাজপেয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন, যা সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অংশ হিসেবে পরিকল্পিত। এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাখা হয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে ম্যাক্রন নরেন্দ্র মোদিকে “প্রিয় বন্ধু” বলে সম্বোধন করে দু’দেশের সহযোগিতা আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে দু’দেশের সম্পর্ককে “আরও দূর পর্যন্ত” নিয়ে যাওয়া হবে, যা সামরিক, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
মুম্বাই সফরের আগে নিউ দিল্লি সরকার রাফেল জেটের বৃহৎ অর্ডার নিশ্চিত করেছে এবং জানুয়ারিতে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে ত্বরান্বিত করবে এবং রাফেল চুক্তির জন্য আর্থিক কাঠামো সরবরাহ করবে।
ম্যাক্রন বুধবার ও বৃহস্পতিবার নিউ দিল্লিতে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন, যেখানে উভয় দেশ AI গবেষণা ও শিল্প উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা উপস্থাপন করবে। এই শীর্ষ সম্মেলনটি দুই দেশের প্রযুক্তি সংযোগকে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত।
গত দশকে ভারত রাশিয়ার ওপর সামরিক সরবরাহের নির্ভরতা কমাতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ফ্রান্সের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের সঙ্গে চুক্তি করে ভারত নিজস্ব রক্ষা ক্ষমতা বাড়াতে চায় এবং দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করে। রাফেল জেটের অর্ডার এই কৌশলের একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রাফেল জেটের ক্রয় অনুমোদন করেছে এবং অধিকাংশ জেট দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হবে বলে জানিয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি ভারতীয় শিল্পকে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।
প্যারিসের সায়েন্সেস পোর আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের ভারত বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফ জাফ্রেলো এই চুক্তিকে “শতাব্দীর চুক্তি” বলে উল্লেখ করেছেন, কারণ এটি ফ্রান্স ও ভারতের মধ্যে সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাবে। তিনি যোগ করেন যে এই চুক্তি উভয় দেশের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভবিষ্যতে রাফেল জেটের চুক্তি সম্পন্ন হলে দুই দেশের রক্ষা শিল্পে যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ক্ষেত্রে আরও সহযোগিতা প্রত্যাশিত। এছাড়া AI শীর্ষ সম্মেলনের ফলাফলও পরবর্তী সপ্তাহে নিউ দিল্লিতে আরও আলোচনা হবে, যেখানে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। এই সব উদ্যোগের লক্ষ্য ভারত-ফ্রান্স সম্পর্ককে সামরিক, প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সমন্বিতভাবে শক্তিশালী করা।



