কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলায় আজ রাত প্রায় নয়টার দিকে এক্সপাট্রিয়েট পরিবারের তিনজনের হত্যা ঘটেছে। মৃতদেহগুলো স্থানীয়দের জানার পর পুলিশ দল সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ঘটনাস্থল হল গারামোরা ইউনিয়নের মনিপুর গ্রাম, যেখানে রাত্রিকালীন সময়ে অস্বাভাবিক শব্দ শোনা গিয়েছিল।
হত্যার শিকার ছিলেন ২২ বছর বয়সী পাপিয়া আক্তার সুখী, যিনি সৌদি আরবের এক কর্মীর স্ত্রী। তার সঙ্গে নিহত হয় তার চার বছর বয়সী পুত্র হোসেন, যাকে পরিবারে ‘হোসেন’ নামে ডাকা হয়। তৃতীয় শিকারের নাম জুবায়ের, পাঁচ বছর বয়সী, যিনি পাপিয়ার স্বামীর ভাই সাত্তার সন্তান এবং পরিবারে ‘জুবায়ের’ নামে পরিচিত।
পুলিশ জানায়, ঘটনাটি রাতের অন্ধকারে ঘটেছে এবং গৃহে প্রবেশের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। বাড়িটি দুই তলা, মাটিতে মাটির ফ্লোরিং এবং ছাদে টাইলস, যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা রাত্রে অস্বাভাবিক শব্দ শোনার পর দ্রুত পুলিশকে জানায়।
সকালবেলায় স্থানীয়দের জানাতে গিয়ে গৃহে পৌঁছানো দল মৃতদেহগুলো ঘরে পাওয়া জানায়। দেহগুলোকে দ্রুতই নিকটস্থ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়। দেহের অবস্থার ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার অনুমান করা হচ্ছে।
হোমনা থানা অফিসার-ইন-চার্জ মোর্শেদুল আলমের নির্দেশে বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়। এই দলে থানা ইনস্পেক্টর, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং সিআইডি (সিআইডি) প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত। দলটি ঘটনাস্থলে ফরেনসিক দল পাঠিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে এবং স্থানীয়দের সাক্ষাৎকার নেয়।
ফরেনসিক রিপোর্টে দেখা গেছে দেহে কাটার চিহ্ন রয়েছে, যা ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার নির্দেশ করে। তবে এখনও কোনো রক্তের দাগ বা গুলি করার চিহ্ন পাওয়া যায়নি, ফলে অস্ত্রের ধরন নির্ধারণে অতিরিক্ত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা অতিরিক্ত প্রমাণ সংগ্রহের জন্য গ্রামবাসীর সাক্ষাৎকার চালিয়ে যাচ্ছেন এবং সম্ভাব্য ভিডিও রেকর্ডিং সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।
শিকারের স্বামী জাহিরুল এবং তার ভাই সাত্তার উভয়েই বর্তমানে বিদেশে বসবাস করছেন। জাহিরুল সৌদি আরবে কাজ করেন এবং সাত্তার যুক্তরাজ্যে কর্মরত। তাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে পুলিশ জানায়, তারা দুজনই কাজের জন্য বিদেশে রয়েছেন এবং তাত্ক্ষণিকভাবে দেশে ফিরে আসতে পারেন না।
পুলিশের মতে, হত্যার পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ, সম্পত্তি সমস্যা বা অন্য কোনো প্রেরণা থাকতে পারে, তবে এখনো কোনো স্পষ্ট সূত্র পাওয়া যায়নি। তদন্তের পরবর্তী ধাপে সন্দেহভাজনদের তালিকা তৈরি করে গ্রেফতার করা হবে, এবং সম্ভাব্য গ্যাং বা অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ অনুসন্ধান করা হবে। এছাড়া, স্থানীয় নিরাপত্তা বাড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ পেট্রোল বাড়ানো হয়েছে এবং গ্রামবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জরুরি শিবির গঠন করা হয়েছে।
হোমনা থানা থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রমাণ সংগ্রহের পর মামলাটি কুমিল্লা জেলায় দাখিল করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। শিকারের পরিবারকে আইনি সহায়তা প্রদান করা হবে এবং তাদের জন্য মানসিক সহায়তা সেবা চালু করা হবে। মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে পরবর্তী তথ্য পাওয়া গেলে পুলিশ দপ্তর যোগাযোগের নম্বরের মাধ্যমে জনসাধারণকে জানানো হবে।
স্থানীয় মানুষ এই রকম হিংসাত্মক ঘটনার শোক প্রকাশ করে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানায়। গ্রামবাসীরা ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ রোধে কঠোর ব্যবস্থা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছেন।
হোমনা থানা অফিসার-ইন-চার্জ মোর্শেদুল আলমের মতে, তদন্ত চলাকালীন কোনো দোষী সনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত জনসাধারণকে অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশ করা হবে না। তিনি সকলকে শান্ত থাকতে এবং আইনগত প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রাখতে আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ন্যায়বিচার দ্রুত সম্পন্ন হয়।
এই মামলায় তদন্তের অগ্রগতি এবং সম্ভাব্য দোষী সনাক্তকরণে সময় লাগতে পারে, তবে পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে বিষয়টি সমাধানে কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নতুন কোনো তথ্য প্রকাশিত হলে তা জনসাধারণের সঙ্গে শেয়ার করা হবে।



