কুমিল্লা জেলার হোমনা থানার অধীনে ঘারমোড়া ইউনিয়নের মনিফুর গ্রামে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা প্রায় ৬ টার দিকে গলা কেটে তিনজনের মৃত্যু ঘটেছে। মৃতদেহগুলো ঘরের তিনটি আলাদা কক্ষে পাওয়া গিয়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিশাল আতঙ্কের সঞ্চার করেছে। ঘটনাস্থলটি গ্রামটির কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত পুরনো একক পরিবারিক বাড়ি, যেখানে পূর্বে কোনো অপরাধের রেকর্ড পাওয়া যায়নি।
মৃত ব্যক্তিরা হলেন জহিরুল ইসলামের স্ত্রী পাপিয়া আক্তার সুখী, বয়স ৩২ বছর, তার চার বছর বয়সী পুত্র হোসাইন, এবং জহিরুলের ভাই আবদুস সাত্তারের পাঁচ বছর বয়সী সন্তান জোবায়। তিনজনই ঘরের অভ্যন্তরে একসাথে বাস করতেন এবং পরিবারিক বন্ধন খুবই দৃঢ় ছিল বলে প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন। ভুক্তভোগীদের নাম ও বয়স স্থানীয় প্রশাসনের রেকর্ডে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে গ্রামের লোকজন জহিরুলের বাড়ি থেকে কোনো শব্দ না শোনার পর তার সন্ধান করতে গিয়ে জানালার মাধ্যমে ঘরের ভেতরে মৃতদেহের দৃশ্য দেখেন। প্রথমে তারা সন্দেহ করে যে বাড়িতে কোনো রোগ বা দুর্ঘটনা ঘটেছে, তবে দ্রুতই বুঝতে পারেন যে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। তৎক্ষণাৎ তারা নিকটস্থ হোমনা থানায় ঘটনাটি জানিয়ে দেন, যেখানে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
হোমনা থানার ওয়্যারিং অফিসার মো. মোরশেদুল আলম চৌধুরী ঘটনাটিকে নিশ্চিত করে জানান, গলা কেটে হত্যা করা অপরাধী(দের) তিনটি ঘরে মৃতদেহ রেখে পালিয়ে গেছেন। পুলিশ দল ঘটনাস্থল সুরক্ষিত করে, প্রমাণ সংগ্রহের জন্য ফোরেনসিক দলকে ডেকে আনে এবং মৃতদেহগুলো স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যায়। মৃতদেহগুলো পরে ফরেনসিক বিশ্লেষণের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়।
ফরেনসিক দল মৃতদেহ থেকে রক্তের নমুনা, ত্বকের টুকরা এবং গলা কেটে যাওয়ার চিহ্নের বিশদ রেকর্ড গ্রহণ করে। ময়নাতদন্তের ফলাফল পাওয়া মাত্রই হত্যার পদ্ধতি ও সময় নির্ধারণে সহায়তা করবে বলে বলা হচ্ছে। এছাড়া, বাড়ির ভিতরে এবং আশেপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ক্যামেরা, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে।
থানা অফিসাররা এখন পর্যন্ত কোনো সন্দেহভাজন বা অপরাধীর নাম প্রকাশ করেননি, তবে তদন্তের অধীনে বাড়ির নিকটবর্তী এলাকায় ফোরেনসিক দল এবং গোয়েন্দা দল কাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে শোনা গলিপথ, সম্ভাব্য বিরোধ বা পূর্বের কোনো ঝগড়া সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এছাড়া, গ্রামটির প্রধান রাস্তা ও প্রবেশদ্বারগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ পেট্রোল বাড়ানো হয়েছে, যাতে কোনো সন্দেহভাজন পালাতে না পারে।
স্থানীয় মানুষদের মধ্যে আতঙ্ক ও শোকের পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। বহু পরিবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছে। গ্রামটির মুদির দোকান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে শোকের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ভুক্তভোগীর পরিবারকে সমবেদনা জানানো হয়েছে।
গলা কেটে হত্যা বাংলাদেশের ফৌজদারি কোডের ধারা ৩৯১(১) অনুসারে মৃত্যুদণ্ড বা আজীবন কারাদণ্ডের দায়ী অপরাধ। আইনগত প্রক্রিয়া অনুসারে সন্দেহভাজন গ্রেফতার হলে আদালতে মামলার শোনানির ব্যবস্থা হবে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে যথাযথ শাস্তি নির্ধারিত হবে। বর্তমানে তদন্তের ফলাফল পাওয়া পর্যন্ত এই আইনগত ধারা প্রয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয় উজেলা পরিষদ সদস্য ও গ্রাম প্রধান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নিরাপত্তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তারা গ্রামটির চারপাশে অতিরিক্ত গার্ড পোস্ট স্থাপন, রাতের সময় আলো বাড়ানো এবং স্থানীয় যুবকদের মধ্যে সচেতনতা কর্মসূচি চালু করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া, পরিবারিক নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসন বিশেষ কর্মশালা আয়োজনের কথা বলেছে।
এই ঘটনার পূর্ণ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় জনগণ সতর্কতা বজায় রাখছে এবং কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে স্পষ্ট তথ্যের প্রত্যাশা করছে। পুলিশ এখনও সকল সূত্রের দিকে নজর রাখছে এবং যে কোনো নতুন তথ্য পাওয়া মাত্রই তদন্তে অন্তর্ভুক্ত করবে। সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত এবং নির্ভুল তদন্তের প্রয়োজনীয়তা সকলেই অনুভব করছেন।



