নতুন সরকারের গঠন প্রক্রিয়ার শেষ মুহূর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ডে মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রদানকারী একটি কোম্পানিকে ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি এক দিনের নোটিসে জরুরি বোর্ড সভা ডাকা হলেও, কর্মকর্তাদের আপত্তি ও প্রশ্নের পর শেষ পর্যন্ত অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
সেই দিন বিকেলে বোর্ডের পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানালেন, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি; কেবল মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বোর্ডের অনুরোধ ছিল প্রস্তাবের যাচাই‑মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি সভায় উপস্থাপন করা, অনুমোদন চাওয়া নয়।
এই ঘটনার পূর্বে, সোমবার সকালেই বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সমিতির সভাপতি একে এম মাসুম বিল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। তারা নতুন সরকারের গঠন চলাকালীন এক দিনের নোটিসে জরুরি বোর্ড সভা ডাকার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের ক্ষতি হিসেবে সমালোচনা করেন।
মাসুম বিল্লাহ উল্লেখ করেন, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স প্রদান, যা ব্যাপক প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর শপথ গ্রহণ ও সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় এ ধরনের হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া স্বাভাবিক নয় এবং তা ব্যাংকের স্বতন্ত্রতা ও ন্যায্যতা ক্ষুণ্নের সম্ভাবনা তৈরি করে।
সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়, প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংকের আবেদনপত্রে একটি বিদ্যমান ব্যাংকের মালিকানা ৫১ শতাংশ রয়েছে, যদিও নিয়ম অনুযায়ী কোনো ব্যাংকের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশই মালিকানা রাখতে পারে। সংশ্লিষ্ট এমএফএস কোম্পানির নাম প্রকাশ না করা সত্ত্বেও, বক্তারা জানায় যে বাজারে এই কোম্পানির শেয়ার সবচেয়ে বেশি এবং এটি মোবাইল ব্যাংকিং সেবার শীর্ষে রয়েছে।
আহসান এইচ মনসুর, যিনি তখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন, পূর্বে ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। মাসুম বিল্লাহের মতে, এই প্রস্তাবটি বিশেষ সুবিধা প্রদান করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, যা ব্যাংকের স্বতন্ত্রতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার নীতির বিরোধী।
ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের অনুমোদন না হওয়ায় বাজারে কিছুটা শ্বাসরুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যদি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তবে অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থী ও বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চিততা অনুভব করতে পারে, যা ডিজিটাল আর্থিক সেবার উন্নয়নকে ধীরগতি দিতে পারে। একই সঙ্গে, ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের ওপর প্রশ্ন উঠলে, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীর আস্থা কমে যেতে পারে এবং দেশের ফিনটেক ইকোসিস্টেমের আকর্ষণীয়তা হ্রাস পেতে পারে।
অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমান নিয়মের কঠোরতা বজায় থাকবে, যা ব্যাংকের মালিকানার সীমা অতিক্রম না করা নিশ্চিত করে। এটি দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন। তবে, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেক্টরের দ্রুত বিকাশের জন্য নীতি নির্ধারকদের আরও স্পষ্ট ও প্রগতিশীল কাঠামো তৈরি করা জরুরি, যাতে নতুন প্রবেশকারীরা ন্যায্য সুযোগ পায়।
সংক্ষেপে, জরুরি বোর্ড সভায় ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের অনুমোদন না হওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব রক্ষার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়, তবে এটি ফিনটেক শিল্পের উন্নয়ন ও বিনিয়োগ আকর্ষণে কিছু ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে নিয়মের স্পষ্টতা ও প্রয়োগে সামঞ্জস্য বজায় রাখলে, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেক্টরকে সুস্থ ও টেকসইভাবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।



