দক্ষিণ স্পেনের একটি প্রাচীন নিদর্শনস্থলে পাওয়া একটি হাতির পায়ের হাড়ের বিশ্লেষণ থেকে হ্যানিবালের যুদ্ধহাতিরের অস্তিত্বের নতুন প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবেষকরা এই হাড়টি কর্ডোবা নিকটবর্তী কোলিনা দে লস কেমাদোস নামের স্থানে আবিষ্কার করেন, যেখানে ২০২০ সালে একটি আয়রন এজের তলানিতে কাঠের প্রাচীর ভেঙে গিয়েছিল। হাড়টি প্রায় দশ সেন্টিমিটার ঘনক আকারের এবং কার্বন ডেটিং পদ্ধতিতে দ্বিতীয় পুনিক যুদ্ধের সময়ের বলে নির্ধারিত হয়েছে।
এই আবিষ্কারটি ইউরোপীয় প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে হাতির হাড়ের উপস্থিতি খুবই বিরল বলে গবেষক দল উল্লেখ করেছে। পূর্বে ইউরোপে হাতির হাড়ের রেকর্ড খুব কমই পাওয়া গিয়েছে, ফলে এই নিদর্শনটি ঐতিহাসিক অনুমানকে সমর্থন করার সম্ভাবনা রাখে। দলটি হাড়ের গঠন বিশ্লেষণ করে আধুনিক আফ্রিকান হাতি ও স্টেপ ম্যামথের তুলনা করে দেখেছে যে এটি সত্যিকারের হাতির হাড়, কোনো প্রাচীন স্তন্যপায়ী প্রাণীর নয়।
হ্যানিবাল, ক্যারথেজের বিখ্যাত সামরিক নেতা, তৃতীয় শতাব্দীর শেষের দিকে রোমের বিরুদ্ধে তিনটি পুনিক যুদ্ধ পরিচালনা করেন। ঐতিহাসিক সূত্রে বলা হয় যে তিনি ২১৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ৩৭টি যুদ্ধহাতিরসহ আলপস পর্বত অতিক্রম করে ইতালিতে আক্রমণ করেন। তবে সেই সময়ের কোনো শারীরিক নিদর্শন পাওয়া যায়নি, ফলে তার হাতির বাহিনীর অস্তিত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছিল। এখন স্পেনের এই হাড়টি সেই বিতর্কে নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে।
হাঁটাচলা পথে স্পেন ও ফ্রান্সের মধ্য দিয়ে হ্যানিবালের সেনাবাহিনীর অগ্রগতি অনুমান করা হয়, এবং এই হাড়টি সম্ভবত আলপস পার হওয়ার আগে স্পেনে মারা যাওয়া একটি হাতির অবশিষ্টাংশ। গবেষকরা হাড়টি কোলিনা দে লস কেমাদোসের ধ্বংসাবশেষের নিচে পেয়েছেন, যেখানে একই সময়ের আর্টিলারি, মুদ্রা এবং সিরামিকের টুকরোও পাওয়া গিয়েছে। এই বস্তুগুলো স্থানটি কোনো যুদ্ধের ক্ষেত্র ছিল বলে ইঙ্গিত করে, যা হ্যানিবালের সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নির্দেশ করতে পারে।
কার্বন ডেটিং ফলাফল দেখায় যে হাড়টি দ্বিতীয় পুনিক যুদ্ধের শেষের দিকে, অর্থাৎ তৃতীয় শতাব্দীর শেষ থেকে দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরুর মধ্যে তৈরি। এই সময়কাল হ্যানিবালের ইউরোপীয় অভিযান এবং আলপস পার হওয়ার সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষকরা হাড়ের রেডিওকার্বন স্তর বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছেন যে এটি প্রায় ২২০০ বছর পুরনো।
হাঁটাচলা ও সরবরাহের দিক থেকে এই বিশাল প্রাণীকে ইউরোপে নিয়ে আসতে জাহাজের মাধ্যমে পরিবহন করা প্রয়োজন ছিল, কারণ হাতি কোনো স্থানীয় প্রজাতি নয়। তাই হ্যানিবালের সেনাবাহিনীর লজিস্টিক ক্ষমতা এবং সমুদ্রপথে সরবরাহের জটিলতা এই নিদর্শন থেকে অনুমান করা যায়। এছাড়া, হাড়ের পাশাপাশি পাওয়া মুদ্রা ও সেরামিকের শৈলীও ক্যারথেজীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা হ্যানিবালের ক্যাম্পের সম্ভাব্য উপস্থিতি নির্দেশ করে।
এই আবিষ্কারটি হ্যানিবালের যুদ্ধহাতিরের অস্তিত্বকে সমর্থনকারী প্রথম স্পষ্ট শারীরিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও হাড়টি আলপস পার হওয়ার আগে মারা গিয়েছিল, তবু এটি হ্যানিবালের সেনাবাহিনীর পথে হাতি ব্যবহার করার ঐতিহাসিক রেকর্ডকে শক্তিশালী করে। গবেষক দল ভবিষ্যতে একই সময়ের অন্যান্য স্থানে অতিরিক্ত নিদর্শন অনুসন্ধান করার পরিকল্পনা করেছে, যাতে হ্যানিবালের সামরিক কৌশল ও লজিস্টিক সম্পর্কে আরও বিশদ জানা যায়।
এই নতুন তথ্যের আলোকে পাঠকদের জন্য প্রশ্ন রয়ে যায়: হ্যানিবালের যুদ্ধহাতিরের ব্যবহার কি তার বিজয়ের মূল চাবিকাঠি ছিল, নাকি তা কেবল একটি প্রতীকী উপাদান? ভবিষ্যত গবেষণা এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে এবং প্রাচীন সামরিক ইতিহাসের নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে।



