অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক আনু মুহাম্মদ সোমবার ঢাকার শাহবাগে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তে অনুষ্ঠিত ইলা মিত্রের জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত কৃষি চুক্তিকে ‘অধীনতামূলক’ বলে সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই চুক্তি দেশের কৃষি খাতকে কর্পোরেট পুঁজির অধীন করে দিয়েছে এবং স্বতন্ত্র নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতা সীমিত করেছে।
আনু মুহাম্মদ, যিনি অর্থনীতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে বহু বছরের অভিজ্ঞতা রাখেন, তার মন্তব্যে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ পায়। তিনি যুক্তি দেন, চুক্তির শর্তাবলী এমনভাবে গঠন করা হয়েছে যে বাংলাদেশ সরকার মার্কিন সরকারের কৃষি ও কর্পোরেট স্বার্থের বাইরে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি চুক্তিটিকে দেশের স্বনির্ভর কৃষি নীতির জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
অনুষ্ঠানটি ইলা মিত্রের জন্মশতবার্ষিকী স্মরণে আয়োজন করা হয়েছিল এবং মিলনায়তে তীব্র আলোচনার পরিবেশ গড়ে ওঠে। উপস্থিতি মূলত তেবহাগা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ছিল। এ দিনটি তেবহাগা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বর্তমান কৃষি নীতির সমালোচনার মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে।
তেবহাগা আন্দোলন ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলায় ভূমিহীন কৃষক ও জমির মালিকের দাবিতে উত্থাপিত হয়েছিল। কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থনে ইলা মিত্র কলকাতা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে গিয়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। আন্দোলনটি সামন্তব্যবস্থার বিরোধিতা এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হিসেবে স্বীকৃত।
আনু মুহাম্মদ তেবহাগা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে বর্তমান কৃষি চুক্তির সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর কৃষি ব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন হলেও এখন তা কর্পোরেট পুঁজির আক্রমণের শিকার হয়েছে। তার মতে, কৃষকরা এখন পুঁজির শৃঙ্খলে বন্দী হয়ে পড়েছে এবং তাদের স্বতন্ত্র অধিকার হ্রাস পেয়েছে।
চুক্তির বিশদে তিনি উল্লেখ করেন, এতে বাংলাদেশের কৃষি নীতি মার্কিন সরকারের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে, ফলে দেশের স্বনির্ভরতা ও কৃষকদের স্বায়ত্তশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই ধরনের চুক্তি দেশের দীর্ঘমেয়াদী কৃষি উন্নয়নের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে এবং তা তীব্র সমালোচনার বিষয়।
আনু মুহাম্মদ উল্লেখ করেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে চুক্তি প্রণয়নে যুক্ত ছিলেন, এখন এই অধীনতামূলক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তার এই মন্তব্য চুক্তির ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন ও সংশোধনের সম্ভাবনা উন্মোচন করে।
অনুষ্ঠানে এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা ইলা মিত্রের জীবন ও কর্মের ওপর একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি তেবহাগা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রভাব ও মিত্রের নেতৃত্বের বিশ্লেষণ করেন, যা উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে গভীর প্রতিফলন সৃষ্টি করে।
অনুষ্ঠানের সংস্থার চেয়ারম্যান খুশী কবির সঞ্চালনা করেন এবং সমাবেশের সুষ্ঠু পরিচালনা নিশ্চিত করেন। তিনি সমাবেশের লক্ষ্য ও তেবহাগা আন্দোলনের আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে অংশগ্রহণকারীদের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফাওজিয়া মোসলেম এবং জাতীয় আদিবাসী পরিষদের খোকন সুইটেন মুর্মুওও তাদের মতামত প্রকাশ করেন। ফাওজিয়া মোসলেম নারী কৃষকদের অবস্থান ও অধিকার নিয়ে কথা বলেন, আর মুর্মুও আদিবাসী সম্প্রদায়ের কৃষি নীতির প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করেন।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে ‘বঞ্চনা ও বৈষম্যবিরোধী সাঁওতাল বিদ্রোহের কিংবদন্তি নেত্রী–ইলা মিত্রের জন্মশতবর্ষ’ শীর্ষক একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এই প্রকাশনা তেবহাগা আন্দোলনের ঐতিহাসিক দিক ও ইলা মিত্রের অবদানের নথি হিসেবে কাজ করবে।
আনু মুহাম্মদের মন্তব্য এবং তেবহাগা আন্দোলনের স্মরণে এই সমাবেশের ফলে কৃষি চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনার তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। সরকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছ থেকে চুক্তির শর্তাবলী পুনর্বিবেচনার দাবি বাড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে কৃষি নীতির দিকনির্দেশনা পুনর্নির্ধারণের সম্ভাবনা উন্মুক্ত হতে পারে।



