ঢাকা, শাবাগের জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তে সোমবার তেবহাগা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ইলা মিত্রের জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ ও প্রাক্তন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আনু মুহাম্মদ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৃষি খাতের চুক্তি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকার (মার্কিন সরকার) ও অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি কৃষকদের ওপর কর্পোরেট পুঁজির শৃঙ্খল আরও দৃঢ় করেছে এবং এতে কৃষকরা নতুন এক অধীনতার শর্তে আটকে গেছেন।
আনু মুহাম্মদ বলেন, এই চুক্তি এক ধরনের ‘অধীনতার চুক্তি’ এবং এর ফলে ড. ইউনূস বিদায় নিচ্ছেন। তিনি তেবহাগা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ১৯৪৬ সালে সামন্তব্যবস্থার বিরোধে গঠিত এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসন ও জমিদার শোষণের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়েছিল। তবু আজকের কৃষি ব্যবস্থা আর ঐ সামন্তব্যবস্থা নয়, বরং কর্পোরেট পুঁজির আক্রমণে ভুগছে।
অনুষ্ঠানে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ইলা মিত্রের কর্মজীবন ও ত্যাগের কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, মিত্র সংসদ সদস্য, কলেজ শিক্ষক, বাজারে রান্না করা এবং পার্টি অফিসে কাজ করা সবকিছুই একসাথে সামলাতেন, যা তার অদম্য কর্মশক্তি প্রকাশ করে। সেলিমের মতে, ইতিহাসের বিকৃতি প্রায়শই ভুল তথ্যের মাধ্যমে ঘটে, তবে সবচেয়ে বড় বিকৃতি হল সত্যকে লুকিয়ে রাখা।
সেলিম তীব্রভাবে জোর দেন, বর্তমান পাঠ্যপুস্তকে ইলা মিত্রের নাম বা তেবহাগা আন্দোলনের উল্লেখ নেই, যা শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক সচেতনতা থেকে বঞ্চিত করে। তিনি বলেন, এই লড়াইকে পুনরায় উত্থাপন করা এবং তেবহাগা আন্দোলনের মূল দাবিগুলোকে পুনর্বিবেচনা করা এখন অতীব জরুরি।
মুজাহিদুল ইসলাম আরও উল্লেখ করেন, জমি বণ্টন করা যায়, তবে স্বার্থের বণ্টন করা যায় না। তিনি যুক্তি দেন, কৃষক ও শ্রমিকদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য স্বতন্ত্রভাবে দাঁড়াতে হবে, কারণ স্বার্থ কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক দিকেও গুরুত্বপূর্ণ।
তেবহাগা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল উৎপাদিত ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ জমিহীন কৃষকের এবং এক-তৃতীয়াংশ জমির মালিকের মধ্যে ভাগ করা। এই দাবি ১৯৪৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে গঠিত হয় এবং ইলা মিত্রের নেতৃত্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে পৌঁছায়। আন্দোলনটি কৃষকদের সংগঠিত করে শোষণমূলক জমিদার শাসনকে চ্যালেঞ্জ করে।
আনু মুহাম্মদ চুক্তির প্রভাব বিশ্লেষণ করে বলেন, এখন কৃষকরা কর্পোরেট পুঁজির শৃঙ্খলে আটকে গেছেন, যা তাদের স্বতন্ত্র উৎপাদন ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনকে হ্রাস করে। তিনি যুক্তি দেন, এমন চুক্তি দেশের কৃষি নীতি ও গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।
অনুষ্ঠানের অংশগ্রহণকারীরা তেবহাগা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বর্তমান কৃষি নীতির দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করেন। বেশ কিছু উপস্থিতি ইলা মিত্রের ত্যাগকে স্মরণ করে, তার আদর্শকে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানান।
মার্কিন সরকারের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির বিশদ শর্তাবলী প্রকাশ না করলেও, আনু মুহাম্মদ উল্লেখ করেন, এতে বিদেশি পুঁজির প্রবেশ ও কৃষক সমিতির স্বায়ত্তশাসন সীমিত করার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি ড. ইউনূসের এই পদক্ষেপকে ‘বিদায়’ হিসেবে উল্লেখ করেন, যা দেশের কৃষি সংস্কারকে নতুন দিকনির্দেশে ঠেলে দিতে পারে।
অনুষ্ঠানের শেষে উপস্থিতরা তেবহাগা আন্দোলনের মূল স্লোগান ও নীতি পুনরায় স্মরণ করেন এবং ভবিষ্যতে কৃষক ও শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
এই আলোচনার পর, বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৃষি চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা হবে কিনা এবং দেশের কৃষি নীতি কীভাবে পুনর্গঠন হবে, তা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে। তেবহাগা আন্দোলনের ঐতিহাসিক স্মৃতি ও বর্তমান কৃষি চ্যালেঞ্জের সংযোগ ভবিষ্যৎ নীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



