ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সোমবার হরমুজ প্রণালীর জলপথে ধারাবাহিক সামরিক মহড়া চালু করেছে, যা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের মাধ্যমে জানানো হয়। এই মহড়া নৌবাহিনীর অধীনে, আইআরজিসির প্রধানের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে এবং একই সঙ্গে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। হরমুজ, পারস্য উপসাগরের সংকীর্ণ প্রবেশদ্বার, বিশ্ব তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রুট, তাই এখানে কোনো সামরিক কার্যকলাপ আন্তর্জাতিক নজর কাড়ে।
আইআরজিসি কর্তৃক ঘোষিত এই প্রশিক্ষণ সেশনটি নৌবাহিনীর বিভিন্ন শিপ, সাবমেরিন এবং বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত, যা সমুদ্র নিরাপত্তা ও নৌযুদ্ধের দক্ষতা পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে চালু করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মিডিয়া উল্লেখ করেছে, মহড়া চলাকালীন নৌবাহিনীর ইউনিটগুলো সমন্বিত নেভিগেশন, শত্রু সনাক্তকরণ এবং প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা অনুশীলন করবে। এই ধরনের প্রশিক্ষণ পূর্বে হরমুজে সীমিত পরিসরে অনুষ্ঠিত হলেও, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহৎ নৌবাহিনীর মোতায়েনের পর থেকে এর পরিসর ও তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
মার্কিন সরকার সাম্প্রতিক মাসে পারস্য উপসাগরে তার নৌবাহিনীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে, যার মধ্যে ডেস্ট্রয়ার, ক্রুজার এবং এয়ারড্রপ শিপের সমাবেশ অন্তর্ভুক্ত। এই পদক্ষেপটি ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রোগ্রামের ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর এই বিস্তৃত মোতায়েনের পরই আইআরজিসি হরমুজে প্রশিক্ষণ শুরু করেছে, যা উভয় পক্ষের কৌশলগত অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
হরমুজের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে, এই জলপথে কোনো সামরিক তৎপরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, হরমুজে শিপিং লেনের বন্ধ বা বাধা গ্লোবাল তেল মূল্যে তীব্র ওঠানামা ঘটাতে পারে, যা বিশেষ করে তেল রপ্তানিকর দেশ ও ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলবে। তাই হরমুজে সামরিক কার্যক্রমের কোনো বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সতর্কতা ও পর্যবেক্ষণকে উস্কে দেয়।
এই সময়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জেনেভায় মার্কিন সরকারের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার কূটনৈতিক আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য উপস্থিত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, আরাগচি ও মার্কিন সরকার উভয়ই হরমুজে সামরিক কার্যক্রমের পাশাপাশি পারমাণবিক আলোচনার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দু’পক্ষের আলোচনায় ইরানের বেলিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আঞ্চলিক প্রক্সি সমর্থন এবং পারমাণবিক চুক্তির শর্তাবলী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মার্কিন সরকার ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখার পাশাপাশি আলোচনার বিষয়গুলোকে বিস্তৃত করে তুলেছে, যেখানে ইরানের বেলিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন ও আঞ্চলিক গোষ্ঠীর সমর্থনকে প্রধান উদ্বেগের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইরান সরকার এই দাবিগুলোর প্রতি প্রতিক্রিয়ায় জোর দিয়েছে যে, পারমাণবিক আলোচনার পাশাপাশি তার নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার জন্য সামরিক প্রস্তুতি অপরিহার্য। উভয় পক্ষের এই দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি কূটনৈতিক সমঝোতার জটিলতা বাড়িয়ে তুলেছে।
ইরান ও মার্কিন সরকার ওমানের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনার জন্য মঙ্গলবার একটি সেশন নির্ধারণ করেছে। এই সেশনটি হরমুজে সামরিক মহড়া চলাকালীনই নির্ধারিত হওয়ায়, উভয় পক্ষের জন্য সময়ের চাপ বাড়ছে। বিশ্লেষকরা অনুমান করেন, এই পরোক্ষ আলোচনার ফলাফল হরমুজে সামরিক তৎপরতার পরিমাণ ও তীব্রতায় প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ পারমাণবিক বিষয়গুলোতে অগ্রগতি হলে উভয় দেশই সামরিক দিক থেকে শিথিলতা আনতে পারে।
পূর্বে, জুন মাসে ইসরায়েল ইরানের ওপর এক বিশাল বোমা হামলা চালায়, যা পূর্ববর্তী পারমাণবিক আলোচনার ধারাকে ভেঙে দেয়। সেই ঘটনার পর ইরান ও মার্কিন সরকার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পুনরায় সংলাপ শুরু করে, এবং এই মাসে দু’পক্ষই আলোচনার পুনরায় সূচনা ঘোষণা করেছে। এই পুনরায় সংলাপের পটভূমিতে হরমুজে সামরিক মহড়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর উপস্থিতি উভয়ই কূটনৈতিক চাপের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, হরমুজে সামরিক মহড়া এবং একই সময়ে কূটনৈতিক আলোচনার সমন্বয় ইরান ও মার্কিন সরকারের জন্য দ্বিমুখী কৌশল প্রকাশ করে। তিনি বলেন, হরমুজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পারমাণবিক আলোচনার অগ্রগতি একসাথে না হলে উভয় পক্ষই আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। তাই পরবর্তী সপ্তাহে হরমুজে সামরিক কার্যক্রমের তীব্রতা এবং জেনেভায় আলোচনার ফলাফলই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মূল সূচক হবে।
আসন্ন দিনগুলোতে হরমুজে সামরিক মহড়া কতদিন পর্যন্ত চলবে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর উপস্থিতি কীভাবে পরিবর্তিত হবে এবং জেনেভায় পারমাণবিক আলোচনার ফলাফল কী হবে, এ সবই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে থাকবে। এই বিষয়গুলোই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



