অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার‑উজ‑জামান সোমবার তেজগাঁওস্থিত উপদেষ্টার অফিসে সাক্ষাৎ করেন। দুইজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার এই বৈঠকটি সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ও সহযোগিতা জোরদার করার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়।
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে আছেন, দেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন। অন্যদিকে, জেনারেল ওয়াকার‑উজ‑জামান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার, সামরিক নীতি ও কৌশলগত পরিকল্পনা নির্ধারণে দায়িত্বশীল। উভয়ের মধ্যে এই প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ, সরকার-সেনাবাহিনীর সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে।
বৈঠকের স্থান ছিল তেজগাঁওয়ের প্রধান উপদেষ্টার অফিস, যেখানে উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে তথ্য প্রকাশের পরই সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়। অফিসের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে বজায় রাখা হয়েছিল এবং উপস্থিতি সীমিত রাখার জন্য কেবল প্রয়োজনীয় কর্মী ও কর্মকর্তাই অংশগ্রহণ করেন।
সাক্ষাৎকারের সূচনা হয় উভয় পক্ষের পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময় দিয়ে। জেনারেল ওয়াকার‑উজ‑জামান প্রফেসর ইউনূসকে স্বাগত জানিয়ে হাত মেলান এবং তেজগাঁওয়ের ঐতিহাসিক পরিবেশে এক শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেন। প্রফেসর ইউনূসও একইভাবে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বকে সম্মান জানিয়ে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনে উষ্ণতা প্রকাশ করেন।
আলোচনার মূল বিষয়গুলোতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বর্তমান দায়িত্বকালীন বিভিন্ন নীতি, নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং সামরিক-সিভিল সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা অন্তর্ভুক্ত ছিল। উভয় পক্ষই দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। বিশেষ করে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনীর সমর্থন ও সহায়তা নিয়ে প্রফেসর ইউনূস বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
প্রফেসর ইউনূস উল্লেখ করেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি সেনাবাহিনীর এই সহযোগিতাকে “অমূল্য” বলে বর্ণনা করে, ভবিষ্যতে একই রকম সমন্বয় বজায় রাখার আহ্বান জানান।
জেনারেল ওয়াকার‑উজ‑জামানও একই দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করে বলেন, সেনাবাহিনী সবসময় দেশের সংবিধান ও আইন মেনে চলার পাশাপাশি সরকারকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সমর্থন প্রদান করতে প্রস্তুত। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে দেশের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সেনাবাহিনী ও সরকার একসঙ্গে কাজ করবে।
এই বৈঠকটি অন্তবর্তীকালীন সরকারের রাজনৈতিক দায়িত্বের শেষ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এর গুরুত্ব বাড়ে। সরকার বর্তমানে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগগুলোকে মোকাবিলার জন্য সেনাবাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন। উভয় পক্ষই এই সমন্বয়কে দেশের স্থিতিশীলতা ও শান্তি রক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে দেখছেন।
সিভিল-সেনাবাহিনীর সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সাক্ষাৎ একটি ইতিবাচক সংকেত দেয়। অতীতের কিছু সময়ে উভয়ের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল, তবে বর্তমান বৈঠকটি পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্নির্মাণের একটি ধাপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এ ধরনের উচ্চস্তরের বৈঠক দেশীয় নিরাপত্তা নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সহায়ক।
বৈঠকের পরপরই উভয় পক্ষই ভবিষ্যতে নিয়মিত সমন্বয় সভা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। প্রফেসর ইউনূসের অফিস থেকে জানানো হয়েছে, সেনাবাহিনীর সঙ্গে পরবর্তী আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় নীতি সমন্বয় দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। জেনারেল ওয়াকার‑উজ‑জামানও একইভাবে সেনাবাহিনীর উচ্চতর কমান্ডারদের সঙ্গে নীতি-নির্ধারণে সক্রিয় অংশগ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
সারসংক্ষেপে, তেজগাঁওতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকটি সরকার-সেনাবাহিনীর সমন্বয়কে শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মান ও কৃতজ্ঞতা ভবিষ্যতে দেশের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু পরিচালনায় সহায়তা করবে বলে আশা করা যায়।



