সৈয়দ নাজমুস সাকিব, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের ইংরেজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, ২০১৮ ও ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন। প্রথমবারের দায়িত্বে তিনি হুমকির মুখে পড়ে ছিলেন, আর আট বছর পরের দায়িত্বে কোনো সমস্যাবিহীনভাবে কাজ সম্পন্ন করার কথা জানিয়েছেন। উভয় নির্বাচনই ঢাকার লালবাগের জামিলা খাতুন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের তৃতীয় তলার বুথে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে ভোটারদের উপস্থিতি ও প্রক্রিয়ার পার্থক্য স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাজমুস সাকিব পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভোটের দিন তিনি বুথে বসে কাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই একজন ছাত্রের বয়সী ছেলে তার কাঁধে হাত রেখে বলল, “সবাই ব্যালট বাক্সে দিয়ে দিয়েছে, তুই এখনো দেস নাই ক্যান?” এই কথায় তিনি কিছুক্ষণ থেমে গেলেন। সেই মুহূর্তে তিনি অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য হুমকি পেয়েছিলেন এবং কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে ভয় ও অসহায়তার অনুভূতি বর্ণনা করেছেন।
হুমকির পরেও তিনি দায়িত্ব শেষ করে বাড়ি ফিরে আসেন, তবে ওই অভিজ্ঞতা তার ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। তিনি উল্লেখ করেন, ভোট শুরুর সময় সকাল সাড়ে সাতটায়ই ভোটারদের উপস্থিতি দেখে অবাক হয়েছিলেন, যা ২০১৮ সালের নির্বাচনে অনিয়মের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে তিনি দেখেছিলেন। ভোটারদের ব্যালট পেপার হাতে আসার আগেই বুথে জমায়েত হওয়া তার জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল।
২০১৮ সালের ভোটের দিন নাজমুস সাকিবের কাজের সময়সূচি কঠোর ছিল। তিনি দুপুর ১২টা পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যও নড়তে পারেননি। প্রিসাইডিং কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে অন্যকে দায়িত্ব দিয়ে দুই মিনিটের জন্য বাথরুমে গিয়েছিলেন, এরপর আবার বিকেল তিনটা পর্যন্ত একটানা কাজ চালিয়ে গেছেন। ভোট গণনা শেষে তিনি বাড়ি ফিরে গেছেন।
আট বছর পর, ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নাজমুস সাকিব সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এইবার তিনি বলেন, “ন্যূনতম কোনো সমস্যা ছাড়াই সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছি।” তার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের সুর স্পষ্ট, যা পূর্বের হুমকির স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
২০২৬ সালের ভোটের দিনেও বুথের সামনে ভোটারদের আগমনের সময় অস্বাভাবিকভাবে তাড়াতাড়ি ছিল। সকাল সাড়ে সাতটায়ই ভোটাররা উপস্থিত হয়ে বুথে লাইন গঠন করছিলেন, যা নাজমুস সাকিবকে আবার বিস্মিত করে। তিনি উল্লেখ করেন, “এবার ব্যালট পেপার হাতে আসার আগেই ভোটার হাজির। নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। আর স্বতঃস্ফূর্তভাবে এত মানুষকে ভোট দিতে দেখা এবারই প্রথম।”
দায়িত্বের সময় তিনি আবার সীমিত চলাচল করতে পারছিলেন। প্রিসাইডিং কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে এক সহকর্মীকে কাজের দায়িত্ব দিয়ে তিনি দু’মিনিটের জন্য শৌচাগারে গিয়েছিলেন, এরপর আবার কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। তার মতে, ভোটের পরিমাণ ও প্রক্রিয়া পূর্বের তুলনায় বেশি সুশৃঙ্খল ছিল।
বুথে ভোটদানকারী বেশিরভাগই পুরুষ ভোটার ছিলেন। নাজমুস সাকিবের মতে, ৯০ বছরের বেশি বয়সী এক ভোটার অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে বুথে প্রবেশ করেন। টিপস দিতে চাওয়া ভোটারকে তিনি নিজেই স্বাক্ষর করতে চাইলেন। ভোট দেওয়ার পর ঐ বয়স্ক ব্যক্তি বললেন, “জীবনে আর ভোট দেওয়ার সুযোগ পাব কি না, জানি না, তবে এবার সুষ্ঠুভাবে দিতে পারলাম।”
নাজমুস সাকিব জানান, তিনি নিজে কখনো ভোট দেননি। ২০১৮ ও ২০২৬ উভয় নির্বাচনের দিনই তিনি বুথে কাজ করলেও নিজের ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। এই বিষয়টি তিনি ব্যক্তিগতভাবে উল্লেখ করে বলেন, “এখন পর্যন্ত একবারও নিজের ভোট দিতে পারিনি।”
দুই নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি নির্বাচন প্রক্রিয়ার উন্নয়নের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। ২০১৮ সালের অনিয়মের পরিপ্রেক্ষিতে হুমকি ও অনিশ্চয়তা ছিল, আর ২০২৬ সালে প্রক্রিয়া মসৃণভাবে চলেছে বলে তিনি আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি ভবিষ্যতে ভোটার সচেতনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আরও শক্তিশালী তদারকি প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন।
এই অভিজ্ঞতা নির্বাচন কর্মকর্তাদের জন্য একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। ২০২৬ সালের মসৃণ পরিচালনা ভোটারদের আস্থা বাড়াবে এবং পরবর্তী নির্বাচনে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। নাজমুস সাকিবের মন্তব্যগুলো নির্বাচন কমিশনের কাজের মান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।



