গতকাল রোববার নির্বাচন কমিশন সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের দলভিত্তিক ভোট ভাগ প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায় যে বিএনপি ৪৯.৯৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে, আর জামায়াত-এ-ইসলামি ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট অর্জন করেছে। উভয় দলসহ ইসলামপন্থী গোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে ৩৮ শতাংশের বেশি ভোট সংগ্রহ করেছে।
এই ভোট ভাগের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনী ফলাফলও প্রকাশিত হয়েছে। ফলাফল অনুযায়ী, ইসলামপন্থী দলগুলো তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন জিতেছে। যদিও নির্দিষ্ট আসনের সংখ্যা প্রকাশিত হয়নি, তবে পূর্বের তুলনায় এই ফলাফলকে সর্বোচ্চ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইতিহাসের দৃষ্টিতে দেখা যায়, ১৯৯১ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলো প্রত্যেকবার ১৯টি করে আসন পেয়েছিল। তবে ১৯৯১ সালের পরের কোনো নির্বাচনে সব ইসলামপন্থী দল মিলিয়ে ১৫ শতাংশের বেশি ভোট ভাগ পায়নি। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান ভোট ভাগ উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নির্দেশ করে।
ইসলামপন্থী দলগুলো সর্বনিম্ন আসন পেয়েছিল ১৯৯৬ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে। ওই দুই নির্বাচনে তাদের ভোট ভাগ ও আসন সংখ্যা উভয়ই কম ছিল, যা পূর্বের উত্থান-পতনের সঙ্গে বৈপরীত্যপূর্ণ।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে “সুফি ইসলামপন্থী তরিকত ফেডারেশন” নামে একটি গোষ্ঠী সামনে এসেছে। তারা ২০১৪ সালের নির্বাচনে দুইটি এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে একটি আসন জিতেছিল, যা সবসময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের “আমি-ডামি” নির্বাচনে কোনো ইসলামপন্থী দল জয়ী হতে পারেনি। এই ফলাফল পূর্বের জোটের প্রভাবের অনুপস্থিতি এবং নির্বাচনী পরিবেশের পরিবর্তনকে নির্দেশ করে।
২০১৪ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বড় ইসলামপন্থী দলগুলো, যেমন বিএনপি ও জামায়াত-এ-ইসলামি, অংশগ্রহণ থেকে বাদ পড়েছিল। ফলে ঐ দুই নির্বাচনে এই দলগুলোর ভোট ভাগ ও আসন সংখ্যা শূন্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমানের মতে, ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর বর্তমান উত্থান স্থায়ী নয়। তিনি উল্লেখ করেন যে এই দলগুলো তাদের মৌলিক এজেন্ডা প্রকাশ্যে না এনে, ইসলাম সংক্রান্ত বিষয় লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে, ফলে ভোটের মূল কারণকে ইসলামপন্থী রাজনীতি হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন।
রাহমান আরও বলেন, আওয়ামী লীগের ভোটে কোনো নিষিদ্ধ কার্যক্রমের অনুপস্থিতি এই ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি ইঙ্গিত দেন যে, যদি আওয়ামী লীগ ভোটে অংশ নিত, তবে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত।
১৯৯১ সালে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর ১২টি ইসলামপন্থী দল নির্বাচনে অংশ নেয়। জামায়াত-এ-ইসলামি ছাড়া বাকি দলগুলো সম্মিলিতভাবে ২ শতাংশেরও কম ভোট পায়। জামায়াত-এ-ইসলামি ১২ শতাংশের বেশি ভোট সংগ্রহ করে ২২২ আসনের মধ্যে ১৮টি জয়লাভ করে।
ইসলামিক ঐক্যজোট ৫৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১ শতাংশের কম ভোট পায়, তবে একটি আসন জিততে সক্ষম হয়। অন্যদিকে জাকার পার্টি ২৫১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও কোনো জয় অর্জন করতে পারেনি, এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ৪৩টি আসনে অংশগ্রহণের পরেও কোনো জয় পায়নি।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে, ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর ভোট ভাগের বৃদ্ধি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সমতা ও জোটের গঠনকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে স্পষ্ট যে, তাদের উত্থান স্বল্পমেয়াদী এবং মূল এজেন্ডা প্রকাশের অভাব তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সীমিত করতে পারে।



