দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার পর, রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ উভয়েই প্রথম কার্যদিবসে সূচক ও লেনদেনের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য উত্থান দেখা গিয়েছে। ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দৃঢ় জয়কে কেন্দ্র করে বাজারে ব্যাপক আশাবাদ ছড়িয়ে পড়ে, ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের দৃশ্য দেখা যায়।
বাজার বিশ্লেষকরা জানান, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আস্থা সংকট কাটিয়ে এখন শেয়ারবাজার পুনরায় গতি পেয়েছে। ডিএসই ও সিএসই উভয় সূচকই একাধিক শত পয়েন্ট বাড়ে, এবং লেনদেনের পরিমাণও পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে, প্রধান সূচক একদিনে প্রায় ২০০ পয়েন্টের উপরে উঠে, যা ইতিবাচক প্রবণতার স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বাজারের এই উত্থানকে বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকটের অবসান হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর বিনিয়োগকারীরা বাজারে ফিরে আসা স্বাভাবিক, এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারকে তারা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে উল্লেখ করেন, শেয়ারবাজারের স্থায়ী উন্নতি শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সূচকের উন্নতির ওপর নির্ভরশীল।
অধ্যাপক আহমেদ আরও উল্লেখ করেন, সুদ হারকে যুক্তিসঙ্গত স্তরে নিয়ে আসা, রপ্তানি বৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করা, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করা, এবং ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ র্যাংকিংয়ে উন্নতি করা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার মূল চাবিকাঠি। এছাড়া, দেশীয় বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা এবং কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত দূর করা দরকার। এইসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজারে ভালো কোম্পানির তালিকা দ্রুত বাড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীর আস্থা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
বাজারের অংশগ্রহণকারীরা সতর্ক করে বলেন, হঠাৎ উত্থান দেখে হুজুগে শেয়ার কেনা উচিত নয়। বিনিয়োগের মূল নীতি হল মৌলিকভাবে শক্তিশালী, লাভজনক এবং স্বচ্ছ কোম্পানিতে পুঁজি লগ্নি করা। এ ধরনের কোম্পানিগুলোই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রিটার্ন প্রদান করতে পারে এবং বাজারের অস্থিরতা কমাতে সহায়তা করে।
অর্থনৈতিক সংস্কারের দিক থেকে সরকারকে সুদ হার নীতি, ডলার বাজারের স্থিতিশীলতা, এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের অংশ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বিশেষ করে, শেয়ারবাজারে নতুন ও উচ্চ মানের কোম্পানির তালিকা দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি, যাতে বিনিয়োগকারীরা বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিও গড়ে তুলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, শেয়ারবাজারের বর্তমান উত্থানকে একটি ইতিবাচক সূচক হিসেবে দেখা যেতে পারে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে মৌলিক অর্থনৈতিক সূচকের ধারাবাহিক উন্নতি অপরিহার্য। সুদ হার সমন্বয়, রপ্তানি ও এফডিআই বৃদ্ধির পাশাপাশি, দেশের ব্যবসা পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এই শর্তগুলো পূরণ হলে, শেয়ারবাজারের ইতিবাচক গতি বজায় থাকবে এবং বিনিয়োগকারীর আস্থা আরও দৃঢ় হবে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিকোণ থেকে, বাজারে স্বল্পমেয়াদে অস্থিরতা থাকতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সঠিক নীতি ও সংস্কার বাস্তবায়ন হলে শেয়ারবাজারের প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিক হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। বিনিয়োগকারীদের জন্য মূল পরামর্শ হল, হুজুগে না গিয়ে মৌলিক বিশ্লেষণ ভিত্তিক, সুদৃঢ় আর্থিক অবস্থার কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা, এবং বাজারের সামগ্রিক প্রবণতা ও সরকারী নীতির পরিবর্তনকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা।



