বাংলা একাডেমী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে অমর একুশে বইমেলা উদ্বোধনের পরিকল্পনা জানিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের প্রতি বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস) ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে, তবে স্টল ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফের দাবি তুলে ধরেছে।
বাপুসের মতে, বর্তমান সামাজিক ও ব্যবসায়িক পরিবেশ বিবেচনা করে স্টল ও প্যাভিলিয়ন ভাড়া মওকুফ করা প্রকাশকদের আর্থিক চাপ কমাবে। অন্যদিকে, তিনশতাধিক প্রকাশক ‘প্রকাশক ঐক্য’ নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠন করে, বইমেলা ঈদ-পরবর্তী সময়ে আয়োজনের পক্ষে মত প্রকাশ করেছে। এই গোষ্ঠী ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপের আবেদনও জানিয়েছে।
আয়োজক বাংলা একাডেমী জানিয়েছে, মেলার উদ্বোধনের জন্য প্রায় ৯০ শতাংশ প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। মেলার ঐতিহ্য অনুযায়ী সরকারপ্রধানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়; এই বছরও সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ব্যবস্থা চলছে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমীর আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রকাশকদের স্টল বরাদ্দ করা হয়। মেলার পরিচালনা কমিটির সচিব সেলিম রেজা উল্লেখ করেন, ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মেলা শুরু করার প্রস্তুতি চলমান এবং অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
বাপুসের স্ট্যান্ডিং কমিটির আহবায়ক মো. আবুল বাশার ফিরোজ শেখের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, ঈদ-পরবর্তী সময়ে বইমেলা আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়; ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত তারিখই বাস্তবসম্মত। তিনি আরও বলেন, সরকার ও প্রকাশক সমিতির মধ্যে বিরোধ ব্যবসায়িক স্বার্থের ক্ষতি করতে পারে।
কমিটির একজন সদস্যের মতে, মেলার প্রস্তুতি বেশিরভাগই শেষ হওয়ার পর কিছু প্রকাশক হঠাৎ মেলা পেছাতে চাওয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি এটিকে প্রকাশকদের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করেন, যা মেলার সময়সূচিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলা একাডেমী জানিয়েছে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় স্টল ভাড়া ৫৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে এবং ভর্তুকি প্রদান করবে। তবে প্রকাশক সমিতি সম্পূর্ণ ভাড়া মওকুফ এবং স্টল নির্মাণের খরচও দাবি করছে, যা মেলার আর্থিক পরিকল্পনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
শুক্রবার এক চিঠিতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হস্তক্ষেপের আবেদন করা হয়েছে ‘প্রকাশক ঐক্য’ থেকে। তাদের বক্তব্যে উল্লেখ আছে, ৩০০ টিরও বেশি সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা ২০ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরু হলে অংশ নেবে না। এই অবস্থান মেলার অংশগ্রহণকারী সংখ্যা ও বিক্রয় আয়কে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, বইমেলা দেশের প্রকাশনা শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিক্রয় চ্যানেল। স্টল ভাড়া ও নির্মাণ খরচে সমন্বয় না হলে প্রকাশকরা মেলায় অংশ নিতে দ্বিধা করতে পারে, ফলে বিক্রয় সম্ভাবনা হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে, মেলার দেরি হলে বিক্রয় মৌসুমের শীর্ষ সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য নষ্ট হবে, যা প্রকাশকদের নগদ প্রবাহে প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভাড়া হ্রাসের সিদ্ধান্ত কিছু আর্থিক স্বস্তি প্রদান করবে, তবে সম্পূর্ণ মওকুফের দাবি পূরণ না হলে প্রকাশকদের অংশগ্রহণের হার কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি প্রকাশনা শিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং বইমেলার সামগ্রিক আয়কে সীমিত করতে পারে।
বাপুসের প্রকাশক সমিতি সরকারী নীতির সঙ্গে বিরোধে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, তবে একই সঙ্গে তাদের আর্থিক স্বার্থ রক্ষার জন্য ভাড়া মওকুফের দাবি বজায় রেখেছে। এই দ্বৈত অবস্থান শিল্পের স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলবে।
সারসংক্ষেপে, বাংলা একাডেমীর ২০ ফেব্রুয়ারি বইমেলা উদ্বোধনের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হলেও, প্রকাশক সমিতির ভাড়া মওকুফ ও তারিখ পরিবর্তনের দাবি মেলার সময়সূচি ও আর্থিক কাঠামোতে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। উভয় পক্ষের সমন্বয় না হলে মেলার অংশগ্রহণ, বিক্রয় আয় এবং প্রকাশনা শিল্পের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।



