২০২৬ সালে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে টেডি অ্যাওয়ার্ডের ৪০তম বার্ষিকী উদযাপন করা হচ্ছে। এই পুরস্কারটি কুইয়ার থিমের চলচ্চিত্রকে স্বীকৃতি দেয় এবং বার্লিনের সমকামী সংস্কৃতির ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। টেডি অ্যাওয়ার্ডের মূল উদ্দেশ্য হল সমলিঙ্গিক ও লেসবিয়ান চলচ্চিত্রের সৃজনশীলতা ও সামাজিক প্রভাবকে সম্মানিত করা।
টেডি অ্যাওয়ার্ডের শিকড় ১৯৭৮ সালে বার্লিনের নলডেনডর্ফে অবস্থিত প্রিন্স আইজেনহার্জ বইয়ের দোকানে। জার্মানিতে প্রথম সমকামী বইয়ের দোকান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই স্থানটি আজও “বুখলাডেন আইজেনহার্জ” নামে পরিচিত। বার্লিনালেতে এই বইয়ের দোকানের কোণে সমকামী চলচ্চিত্র উৎসবের পরিকল্পনাকারীরা একত্রিত হন।
১৯৮৭ সালে জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাতা উইল্যান্ড স্পেক এবং মানফ্রেড স্যালজগেবার এই ধারণা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। উভয়ই সমকামী চলচ্চিত্রের সমর্থক ছিলেন এবং স্যালজগেবার ১৯৯৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তারা আন্তর্জাতিক গে ও লেসবিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অ্যাসোসিয়েশন (IGLFFA) নামে একটি বিচারকমণ্ডলী গঠন করেন।
এই বিচারকমণ্ডলীর মাধ্যমে টেডি বেয়ার অ্যাওয়ার্ডের প্রথম সংস্করণ উপস্থাপিত হয়। পুরস্কারের নাম বার্লিনালেতে গৃহীত সোনার ও রৌপ্য ভালুকের পুরস্কারের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে রাখা হয়। পরবর্তীতে নামটি সংক্ষিপ্ত হয়ে টেডি অ্যাওয়ার্ড হয়ে যায়, তবে ভাস্কর্যটি এখনও ভালুকের আকারে থাকে।
টেডি অ্যাওয়ার্ডের প্রথম বিজয়ী ছিলেন স্প্যানিশ পরিচালক পেদ্রো আলমোদোভার, যিনি “ল’আই দে দেসেয়োর” (Law of Desire) চলচ্চিত্রের জন্য পুরস্কার পান। এই ছবিতে অ্যান্টোনিও বান্দেরাস প্রধান ভূমিকায় ছিলেন। আলমোদোভারকে এই স্বীকৃতি তার সমকামী থিমের সাহসিকতার জন্য দেওয়া হয়।
এরপর থেকে টেডি অ্যাওয়ার্ডের বিজয়ী তালিকায় স্বাধীন চলচ্চিত্রের বিশিষ্ট নামগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। টড হেইনস, টিল্ডা স্বিনটন, ডেরেক জারম্যান, রে ইউং, সেলিন সিয়ামা, ফ্রাঁসোয়া ওজন, ক্রিস্টিন ভ্যাচন, জেমস ফ্রাঙ্কো, বাবাটুন্দে আপালোও, উলরিকি ওটিঙ্গার, জে ডুপ্লাস, মনিকা ট্রয়েট, গাস ভ্যান সান্ট, মালগোরজা শুমোস্কা, ইরা স্যাক্স, সোফি হাইড, সেবাস্টিয়ান লেলিও এবং জন হার্টের মতো শিল্পী ও পরিচালকরা পুরস্কার পেয়েছেন।
পুরস্কারটি মূলত বার্লিনালেতে প্যানোরামা বিভাগে প্রদর্শিত চলচ্চিত্রগুলোর উপর কেন্দ্রীভূত ছিল। স্যালজগেবার তত্ত্বাবধানে এই বিভাগে সমকামী থিমের কাজগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। ১৯৯২ সালে টেডি অ্যাওয়ার্ডকে উৎসবের স্বতন্ত্র স্বীকৃত পুরস্কার হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।
চার দশক অতিক্রমের পর টেডি অ্যাওয়ার্ড কুইয়ার সিনেমার আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। এর সফলতা অন্যান্য দেশেও সমকামী চলচ্চিত্রের স্বীকৃতির জন্য অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। প্রতিটি বছর নতুন দৃষ্টিকোণ ও বৈচিত্র্যপূর্ণ গল্পকে সম্মানিত করা হয়।
২০২৬ সালে টেডি অ্যাওয়ার্ডের ৪০তম বার্ষিকী উপলক্ষে বার্লিনালেতে বিশেষ প্রোগ্রাম পরিকল্পনা করা হয়েছে। উৎসবের আয়োজকরা পুরস্কারের ইতিহাস, প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ দিক নিয়ে আলোচনা করার জন্য প্যানেল ও প্রদর্শনী আয়োজন করবেন। এই উদ্যোগটি কুইয়ার চলচ্চিত্রের ধারাবিকতা ও বিকাশকে উৎসাহিত করবে।
টেডি অ্যাওয়ার্ডের স্থায়িত্বের পেছনে সমকামী সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সমর্থন রয়েছে। বইয়ের দোকান থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বিচারকমণ্ডলী পর্যন্ত সকল স্তরে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। এই সমন্বয়ই পুরস্কারকে সময়ের সাথে মানিয়ে নিতে এবং নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য পথপ্রদর্শক করতে সহায়তা করেছে।
টেডি অ্যাওয়ার্ডের ভাস্কর্যটি ভালুকের আকারে থাকলেও তার প্রতীকী অর্থ গভীর। এটি কেবল একটি পুরস্কার নয়, বরং সমকামী সংস্কৃতির দৃঢ়তা ও সৃজনশীলতার প্রতীক। প্রতিটি বিজয়ী এই ভালুকের মাধ্যমে সমকামী চলচ্চিত্রের গর্ব ও দায়িত্ব গ্রহণ করে।
টেডি অ্যাওয়ার্ডের ৪০ বছর পূর্ণ হওয়া মানে সমকামী চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি ও স্বায়ত্তশাসনের দীর্ঘ যাত্রা। এই যাত্রা এখনও চলমান, এবং নতুন গল্পগুলোকে সমর্থন করার জন্য পুরস্কারটি সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বৈচিত্র্যময় কণ্ঠস্বরকে মঞ্চ দেওয়া হবে বলে আশা করা যায়।
বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এই বিশেষ দিকটি বিশ্বব্যাপী কুইয়ার চলচ্চিত্রের মানচিত্রকে সমৃদ্ধ করেছে। টেডি অ্যাওয়ার্ডের মাধ্যমে সমকামী চলচ্চিত্রের শিল্পমূল্য ও সামাজিক প্রভাবকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই স্বীকৃতি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য নতুন সীমানা উন্মোচন করে।
টেডি অ্যাওয়ার্ডের চার দশকের সাফল্যকে স্মরণ করে, শিল্প, সংস্কৃতি ও মানবাধিকার সংযোগের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত হয়। সমকামী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরে সংলাপ গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। এই ধারাবিকতা কুইয়ার সিনেমাকে আরও সমৃদ্ধ ও বহুমুখী করে তুলবে।



