হোয়াইট হাউসের একটি গোপনীয় বৈঠকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ইজরায়েলি সরকারের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চীনে ইরান সরকার থেকে তেল রপ্তানি হ্রাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একমত হন। বৈঠকটি গত বুধবার অনুষ্ঠিত হয় এবং উভয় নেতা তেল বিক্রির ওপর চীনের প্রভাবকে ইরানের পারমাণবিক নীতির ওপর চাপ বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেন। এই সমঝোতা ইরান সরকার এবং চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৈঠকের সময় দুই নেতা মার্কিন সরকার এবং ইজরায়েলি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আলোচনা করেন। উভয় পক্ষই ইরানের তেল বিক্রি কমাতে চীনের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে সমন্বয় করেন। বৈঠকের পরে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই পদক্ষেপটি ইরান সরকারের পারমাণবিক কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
একজন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তার মতে, উভয় দেশ ইরানের তেল রপ্তানি চীনে কমাতে চীনকে লক্ষ্য করে পূর্ণ শক্তি প্রয়োগে একমত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, চীন ইরানের তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করে এবং এই বাজারে কোনো হ্রাস ইরান সরকারের আয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। তাই চীনের সঙ্গে চাপের মাত্রা বাড়ানোকে ইরানের পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীন ইরান সরকার থেকে আমদানি করা তেলের বেশিরভাগই তার মোট তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ গঠন করে। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, চীন ইরানের রপ্তানির প্রায় আট দশক ভাগের বেশি গ্রহণ করে, যা ইরানের জন্য আর্থিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তেল বিক্রির পরিমাণে কোনো হ্রাস ইরানের বাজেটের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে এবং তার পারমাণবিক প্রকল্পের অর্থায়নকে কঠিন করে তুলবে।
ইরান সরকার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটন সরকারের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মুখে রয়েছে। মার্কিন সরকার ইরানকে চুক্তি স্বাক্ষরে রাজি না হলে সামরিক হুমকি জানিয়ে থাকে এবং ইতিমধ্যে ইরানের পার্শ্ববর্তী জলে নৌবহর মোতায়েন করেছে। এই পদক্ষেপগুলো ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমকে সীমাবদ্ধ করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা ব্যাখ্যা করেন।
মার্কিন সরকার ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অভিযান প্রস্তুত করছে। দুইজন মার্কিন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিস্তৃত হতে পারে এবং এতে বিমান, নৌবহর এবং ভূখণ্ডীয় শক্তি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই সম্ভাব্য অভিযানকে ইরানের তেল রপ্তানি হ্রাসের সঙ্গে সমন্বয় করে চীনের ওপর অতিরিক্ত চাপ আরোপের একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ওমানের মধ্যস্থতায় মার্কিন ও ইরানি কূটনীতিকদের মধ্যে আলোচনার দরজা খোলা হয়েছে। ওমানের প্রচেষ্টায় দুই পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে, যা ইরানের ওপর সরাসরি সামরিক আক্রমণ এড়াতে সহায়তা করতে পারে। যদি কোনো চুক্তি সম্পন্ন হয়, তবে ইরান সরকার সাময়িকভাবে মার্কিন সরকারের হুমকি থেকে মুক্তি পেতে পারে।
এই আলোচনার ফলাফল ইরান সরকারকে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি কমিয়ে তার পারমাণবিক নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে। একই সঙ্গে, চীনকে ইরানের তেল রপ্তানি হ্রাসের জন্য আন্তর্জাতিক চাপের মুখে দাঁড়াতে হবে, যা তার জ্বালানি নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। উভয় দিকের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের সমন্বয় ভবিষ্যতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্যের গতিপথকে প্রভাবিত করবে।
মার্কিন সরকার এবং ইজরায়েলি সরকার এই সমঝোতাকে তাদের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। উভয় দেশই ইরানের পারমাণবিক হুমকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সমর্থন বাড়াতে চায় এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন শর্তে নিয়ে আসতে চায়। এই পদক্ষেপগুলোকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অবশেষে, চীনের তেল রপ্তানি নীতি এবং ইরান সরকারের পারমাণবিক কৌশল উভয়েরই ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে এই আলোচনার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এখন এই দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার বাস্তবায়ন এবং ওমানের মধ্যস্থতায় সম্ভাব্য চুক্তির দিকে কেন্দ্রীভূত। পরিস্থিতি কীভাবে বিকশিত হবে তা নির্ভর করবে উভয় পক্ষের কূটনৈতিক নমনীয়তা এবং চাপের মাত্রার ওপর।



