নতুন সরকার গৃহীত হলে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি ও জনসাধারণের প্রত্যাশা একসাথে উঠে আসে। নির্বাচনের পর প্রথম কয়েক মাসে সরকার যে লক্ষ্যগুলো ঘোষণা করে, সেগুলো নাগরিকদের জীবনের মান উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে। এই লক্ষ্যগুলো যদি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, তবে জনমতের অসন্তোষ দ্রুত বাড়ে।
সর্বশেষ নির্বাচনের পর বেশ কয়েকটি দল উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিল, যার মধ্যে মূল্যের হ্রাস, ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি ছিল। এসব প্রতিশ্রুতি শোনার সময় নাগরিকদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়, তবে বাস্তবায়নের গতি যদি ধীর হয়, তবে ভোটারদের বিশ্বাস হ্রাস পায়।
বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, সরকারী নীতির সাফল্য নির্ভর করে তার পিছনে থাকা উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। কোনো দল ক্ষমতায় এলে তার নীতি নির্ধারণের ভিত্তি যদি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি না থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে জনসেবা প্রদান ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বাধা সৃষ্টি করে।
উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি মূলত তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেয়: উন্নয়ন কাদের জন্য, কী ধরনের উন্নয়ন এবং তা কীভাবে অর্জন করা হবে। এই প্রশ্নের ভিত্তিতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি কমানো এবং আয় বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা গঠন করা হয়। বাজার ব্যবস্থা নিজে থেকে এসব বিষয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান করতে পারে না; সরকারী হস্তক্ষেপ অপরিহার্য।
জনপ্রিয় দাবি যেমন পণ্যের দাম কমানো, ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে স্বতন্ত্র নীতি হিসেবে দেখা হয়, তবে প্রকৃতপক্ষে এগুলো উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির ফলাফল। যদি দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট না থাকে, তবে এই দাবিগুলো কেবল অস্থায়ী প্রতিশ্রুতি রয়ে যায়।
বাজারের স্বাভাবিক গতিবিধি, মুদ্রা সঞ্চালন ও বেসরকারি খাতের কার্যক্রমের সঙ্গে সরকারী নীতি সমন্বয় না হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আয় বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নীতি নির্ধারণে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি থাকা জরুরি।
যেকোনো দেশের অর্থনীতি বাহ্যিক ঝুঁকির মুখে পড়ে; যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারীর মতো ঘটনাগুলো সবসময়ই প্রভাব ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ সম্পদ ব্যবহার করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম দেশকে শক্তিশালী বলা হয়। এই সক্ষমতা উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবায়ন ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে দক্ষতা অর্জনের পদ্ধতি ও তার খরচ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দক্ষতা বাড়াতে অতিরিক্ত ব্যয় হলে তা জনসাধারণের আর্থিক বোঝা বাড়াতে পারে, ফলে নীতির গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পায়।
অর্থনীতিবিদদের মধ্যে একটি বিতর্ক চলছে; কেউ বিদেশি বিনিয়োগকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখেন, অন্যদিকে কেউ স্থানীয় সম্পদ ও মানবসম্পদকে অগ্রাধিকার দেন। উভয় দৃষ্টিভঙ্গি উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন কৌশল প্রস্তাব করে।
ভবিষ্যতে ভোটাররা সরকারকে শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবিক উন্নয়নের ফলাফল দিয়ে মূল্যায়ন করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। যদি নতুন সরকার স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া নীতি চালু করে এবং তা নাগরিকের জীবনে পরিবর্তন না আনে, তবে পরবর্তী নির্বাচনে তার ভোটের হার হ্রাস পেতে পারে।
অন্যদিকে, যদি সরকার উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি ভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরি করে, তা কর্মসংস্থান, মুদ্রাস্ফীতি এবং আয় বৃদ্ধিতে স্পষ্ট ফলাফল দেখায়, তবে জনসাধারণের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার সম্ভব। এই বিশ্বাসের পুনর্গঠন পরবর্তী রাজনৈতিক চক্রে সরকারের বৈধতা ও ক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
সারসংক্ষেপে, উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া নীতি নির্ধারণের ফলে সরকারী প্রকল্পের ব্যর্থতা বাড়ে, জনমতের অসন্তোষ বাড়ে এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনে প্রভাব পড়ে। তাই নতুন সরকারকে এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে নীতি গঠন ও বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে নাগরিকের জীবনমান উন্নত হয় এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।



