চিলির স্বনামধন্য ডকুমেন্টারি নির্মাতা মাইতে আলবার্দি তার সর্বশেষ কাজ ‘অ্যা চাইল্ড অফ মাই ওন’ (স্প্যানিশে Un hijo propio) বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ উপস্থাপনা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এই চলচ্চিত্রটি বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে সত্যিকারের সাক্ষাৎকার এবং পুনর্নির্মিত দৃশ্য একত্রে বুনে একটি অনন্য বর্ণনা গড়ে তোলা হয়েছে।
আলবার্দি পূর্বে ‘দ্য মোল এজেন্ট’, ‘দ্য ইটার্নাল মেমরি’ এবং ‘ইন হার প্লেস’ মতো কাজের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। তার ডকুমেন্টারিগুলো নাটকীয় গতি ও মানবিক গভীরতা নিয়ে পরিচিত, আর ‘ইন হার প্লেস’ একটি কাল্পনিক চলচ্চিত্র হলেও বাস্তব ঘটনার অনুপ্রেরণায় তৈরি।
‘অ্যা চাইল্ড অফ মাই ওন’ এ তিনি আবারও বাস্তব ও কাল্পনিকের সীমানা মুছে ফেলেছেন। চলচ্চিত্রটি ২০০০ দশকের শুরুর দিকে মিডিয়ায় আলোচিত একটি সংবাদ ঘটনার ওপর ভিত্তি করে, যেখানে এক তরুণী গর্ভধারণের ভান করে নিজের মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার চেষ্টা করেছিল। আলবার্দি এই গল্পকে পুনরায় জীবন্ত করে তুলতে মূল অংশগ্রহণকারীদের সাক্ষাৎকারের সঙ্গে পুনর্নির্মিত দৃশ্য যুক্ত করেছেন।
গল্পের মূল চরিত্র অ্যালেজান্দ্রা, যিনি একটি হাসপাতালের প্রশাসনিক পদে কাজ করেন, নিজের সন্তান না থাকা নিয়ে পরিবার ও সমাজের চাপের মুখে গর্ভধারণের ভান করেন। তার স্বামী আর্তুরো, যাকে চলচ্চিত্রে আরমান্দো এস্পিটিয়া অভিনয় করেছেন, অ্যালেজান্দ্রার এই পরিকল্পনায় অজান্তে অংশ নেন। অ্যালেজান্দার এই ভান তার গভীর মাতৃত্বের তৃষ্ণা এবং পারিবারিক প্রশ্নের উত্তর দিতে চাওয়ার ফলাফল।
এই প্রকল্পটি আলবার্দির জন্য প্রথমবারের মতো মেক্সিকোতে শুটিং করা হয়েছে, ফলে গল্পের স্থানীয় রঙ ও সংস্কৃতি চলচ্চিত্রে স্বতন্ত্র ছাপ ফেলেছে। মেক্সিকোর সামাজিক কাঠামো ও পারিবারিক প্রত্যাশা গল্পের পটভূমি গঠন করে, যা দর্শকদের জন্য নতুন দৃষ্টিকোণ উন্মোচন করে।
অ্যানা সেলেস্টে মোন্টালভো পেনা অ্যালেজান্দ্রা চরিত্রে অভিনয় করেছেন এবং তার পারফরম্যান্সকে চলচ্চিত্রের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার স্বাভাবিক অভিব্যক্তি ও সূক্ষ্ম অঙ্গভঙ্গি চরিত্রের মানসিক দ্বন্দ্বকে জীবন্ত করে তুলেছে। এছাড়া লুইসা গুজমান, মায়রা সেরবুলো, ক্যাসিও ফিগুয়েরো, আলেজান্দ্রো পোর্টার, মায়রা বাতাল্লা ও আঞ্জেলেস ক্রুজের মতো অভিনেতাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কাস্ট গড়ে উঠেছে।
চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য জুলিয়ান লয়োলা ও এস্তেবান স্টুডেন্ট রচনা করেছেন, এবং মোট দৈর্ঘ্য প্রায় এক ঘণ্টা ছত্রিশ মিনিট। পুনর্নির্মিত দৃশ্যগুলোকে টিভি ডকুমেন্টারির সাধারণ পুনরায় নির্মাণের চেয়ে বেশি সূক্ষ্মভাবে সাজানো হয়েছে, ফলে দর্শককে অতিরিক্ত নাটকীয়তা ছাড়াই মূল ঘটনার সঙ্গে সংযুক্ত রাখা হয়েছে।
প্রদর্শনীতে চলচ্চিত্রটি হাস্যরস ও আবেগের মিশ্রণ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছে। প্রথম অংশে হালকা মেজাজের দৃশ্যগুলো দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণ করে, আর পরের অংশে অ্যালেজান্দ্রার অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম গভীরভাবে প্রকাশ পায়। এই দ্বৈত টোন চলচ্চিত্রকে শুধু বিনোদনমূলক নয়, বরং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজের প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত ইচ্ছার সংঘাতকে তুলে ধরতে সক্ষম করেছে।
‘অ্যা চাইল্ড অফ মাই ওন’ কে একই ধাঁচের কাজের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, বিশেষ করে কিটি গ্রীনের ‘জোনবেনেট’ ডকুমেন্টারির সঙ্গে, যেখানে বাস্তব ঘটনা ও নাট্যিক উপস্থাপনার মিশ্রণ দেখা যায়। তবে আলবার্দির পদ্ধতি আরও স্বচ্ছন্দ ও সৃজনশীল, যা পুনরায় নির্মাণের ক্লিশে এড়িয়ে গিয়ে নতুন বর্ণনামূলক সম্ভাবনা উন্মোচন করে।
বার্লিন ফেস্টিভ্যালে বিশেষ উপস্থাপনা হিসেবে এই চলচ্চিত্রের অন্তর্ভুক্তি আলবার্দির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আরও দৃঢ় করেছে এবং মেক্সিকোর চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতি তার আগ্রহের সূচক হিসেবে কাজ করবে। ভবিষ্যতে এই কাজটি অন্যান্য আন্তর্জাতিক উৎসবে প্রদর্শিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দর্শকদেরকে মেক্সিকোর সামাজিক কাঠামো ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার জটিলতা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে।



