ইরান ডিপুটি পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে তবে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব। এই মন্তব্যটি টেহরানে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার সাক্ষাৎকারে দেওয়া হয়। ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রাম সম্পর্কিত আলোচনার বর্তমান পর্যায়ে এই বক্তব্যের গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য।
মাজিদ তাখত-রাভানচি উল্লেখ করেন, চুক্তি সম্পন্ন করার দায়িত্ব এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে, এবং তারা যদি সত্যিকারের ইচ্ছা দেখায় তবে ইরান চুক্তির পথে অগ্রসর হতে পারে। তিনি যুক্তি দেন, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সৎ ইচ্ছা থাকে তবে সমঝোতার পথ খুলে যাবে। এ কথা বলার সময় তিনি ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের কিছু শর্তে নমনীয়তা প্রকাশের ইঙ্গিত দেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বারবার জোর দিয়ে বলছেন, পারমাণবিক আলোচনার অগ্রগতিতে ইরানই বাধা সৃষ্টি করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি উল্লেখ করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি পছন্দ করেন, তবে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করা “খুব কঠিন”। রুবিওর এই মন্তব্যের পর ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার গতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তুলছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক প্রোগ্রাম সীমাবদ্ধ না হলে সামরিক আঘাতের হুমকি দিয়েছেন এবং অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে তুলছেন। এই হুমকি ইরানের নিরাপত্তা নীতি ও কূটনৈতিক কৌশলে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে আলোচনার পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলছে।
গত মাসে ইরানে জাতীয় পর্যায়ে বিরোধী প্রতিবাদ দমন করা হয়, যার ফলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো হাজার হাজার প্রাণহানির রিপোর্ট করেছে। এই ঘটনাগুলি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে ব্যাপক নিন্দা পেয়েছে এবং ইরানের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবু ইরান সরকার এই দমনকে দেশীয় শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে দাবি করে।
ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা ওমানের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নেন, যা দুই দেশের মধ্যে পুনরায় সংলাপের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়। তাখত-রাভানচি জানিয়েছেন, জেনেভায় মঙ্গলবার দ্বিতীয় রাউন্ডের আলোচনা নির্ধারিত হয়েছে এবং পূর্বের আলোচনাগুলি “ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক দিকের দিকে” অগ্রসর হয়েছে। যদিও এখনো চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করা যায়নি, উভয় পক্ষই আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ইচ্ছুক।
ইরান পারমাণবিক প্রোগ্রামের ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে অগ্রসর হওয়ার সন্দেহকে কিছুটা কমিয়ে দেয়। এই প্রস্তাবটি ইরানের পারমাণবিক নীতি পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই পদক্ষেপের বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করছেন।
মাজিদ তাখত-রাভানচি স্পষ্ট করে বলেন, ইরান পারমাণবিক প্রোগ্রাম সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়েও আলোচনা করতে প্রস্তুত, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত আলোচনা করতে ইচ্ছুক হয়। তবে তিনি কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা হ্রাস বা সম্পূর্ণ বাতিল হবে তা নিশ্চিত করেননি। এই অনিশ্চয়তা ভবিষ্যৎ আলোচনার শর্ত নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
২০১৫ সালের চুক্তিতে ইরান ৪০০ কেজি বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে রপ্তানি করেছিল; বর্তমান আলোচনায় ইরান এই স্টকটি সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর দেয়নি। তাখত-রাভানচি এ বিষয়ে কোনো নিশ্চিতকরণ না দিয়ে বিষয়টি অমীমাংসিত রেখেছেন। এই অনিশ্চয়তা পারমাণবিক চুক্তির সম্পূর্ণতা ও বাস্তবায়নকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা হ্রাসের ইচ্ছা প্রকাশ করে এবং ইরান তার পারমাণবিক সমৃদ্ধি কমাতে সম্মত হয়, তবে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি পুনরায় চালু হতে পারে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হুমকি ও ইরানের অভ্যন্তরীণ দমনমূলক নীতি এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে। পরবর্তী সপ্তাহে জেনেভায় নির্ধারিত আলোচনার ফলাফলই ইরান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সম্পর্কের দিকনির্দেশ নির্ধারণ করবে।



