ব্রাসেলসের বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে ব্রাজিলীয় পরিচালক ক্যারিম আইনৌজের নতুন কাজ ‘রোজবুশ প্রুনিং’ বিশ্বপ্রিমিয়ার হয়েছে। ছবিটি সমৃদ্ধ পরিবারের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা অশান্তি ও ক্ষমতার লড়াইকে কেন্দ্র করে, যেখানে ধনী পরিবারকে রোজবুশের মতো কাটা-ছাঁটা করা হয়। প্রধান চরিত্রে কলাম টার্নার, জেমি বেল, রিলি কিউ, এল ফ্যানিং এবং পামেলা অ্যান্ডারসন অভিনয় করেছেন।
কাহিনীর শুরুতে কলাম টার্নার অভিনীত এড নামের চরিত্র রোজবুশের রূপক ব্যবহার করে পরিবারকে বর্ণনা করেন: “মানুষ গোলাপ, পরিবার রোজবুশ, রোজবুশকে ছাঁটা দরকার”। এডের মাধ্যমে দর্শককে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় এক ধনী স্প্যানিশ ভিলায় বসবাসকারী পরিবারকে, যেখানে সদস্যরা বিলাসবহুল পোশাক, ডিজাইনার জুতা নিয়ে গর্ব করে এবং সেবক ও একে অপরের প্রতি তীক্ষ্ণ মন্তব্য করে।
পরিবারের মধ্যে জটিল সম্পর্কের সূচনা হয় যখন ছোট বোন অ্যানা (রিলি কিউ) ও ছোট ভাই রবার্ট (লুকাস গেজ) একে অপরের প্রতি অস্বাভাবিক আকর্ষণ প্রকাশ করে, যা তাদের মানসিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়। তাদের পিতা, ট্রেসি লেটসের ভূমিকায়, অন্ধ ও নীরব স্বভাবের একজন কঠোর শাসক, যিনি পরিবারের ওপর দমনমূলক হাত চালান। বড় ভাই জ্যাক (জেমি বেল) তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক দেখালেও তার অতীতের গভীর আঘাতের ছাপ স্পষ্ট।
পরিবারের অস্থিরতা বাড়ে যখন জ্যাক তার বান্ধবী মার্থা (এল ফ্যানিং) সঙ্গে একসাথে বসবাসের পরিকল্পনা জানায়। একই সময়ে এডের মা (পামেলা অ্যান্ডারসন) মৃত্যুর গোপন সত্য ধীরে ধীরে উদ্ঘাটিত হয়, যা পরিবারকে আরও বিশৃঙ্খলায় ফেলে দেয়। এই ঘটনাগুলি পরিবারকে ‘ছাঁটা’ প্রক্রিয়ার মুখে নিয়ে আসে, যেখানে কোনো মসৃণ সমাধান নেই।
‘রোজবুশ প্রুনিং’ মূলত ১৯৬৫ সালের ইতালীয় চলচ্চিত্র ‘ফিস্টস ইন দ্য পকেট’ এর তীব্র স্যাটায়ারিক রূপান্তর, যা মারকো বেলোক্কিওর মূল কাজের সামাজিক সমালোচনা বজায় রাখে। স্ক্রিপ্টটি গ্রীক লেখক এফথিমিস ফিলিপ্পোর (যিনি ইওর্গোস ল্যান্থিমোসের সঙ্গে ‘দ্য লবস্টার’ ও ‘কাইন্ডস অফ কাইন্ডনেস’ এ কাজ করেছেন) রচনা, যা আধুনিক যুগের ধনী শ্রেণীর অতিরিক্ততা ও পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করে।
ক্যারিম আইনৌজ, ‘ফায়ারব্র্যান্ড’ ও ‘মোটেল ডেস্টিনো’ এর জন্য পরিচিত, কোভিড-১৯ মহামারীর সময় এই প্রকল্পের ধারণা গড়ে তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, মহামারী সময়ের বিচ্ছিন্নতা ও সামাজিক বৈষম্য চলচ্চিত্রের থিমকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। পরিচালক পরিবারকে এক ধরনের সামাজিক রোজবুশ হিসেবে দেখিয়ে, তাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার দিকগুলোকে উন্মোচন করতে চেয়েছেন।
চিত্রগ্রহণের স্থান হিসেবে স্পেনের এক বিলাসবহুল ভিলা নির্বাচন করা হয়েছে, যেখানে ধনী পরিবারের জীবনযাত্রা ও তাদের অপ্রয়োজনীয় ভোগের দৃশ্যগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ছবিতে ফ্যাশন, গয়না এবং সেবক-সেবিকা সম্পর্কিত সূক্ষ্ম বিবরণ দিয়ে সমৃদ্ধ সমাজের পৃষ্ঠতলকে তুলে ধরা হয়েছে।
‘রোজবুশ প্রুনিং’ এর সঙ্গীত ও চিত্রনাট্য উভয়ই আধুনিক ও তীক্ষ্ণ, যা দর্শকের মনোযোগকে পরিবারিক গোপনীয়তা ও সামাজিক বৈষম্যের দিকে টেনে নিয়ে যায়। চলচ্চিত্রটি সমালোচকদের মধ্যে বিতর্ক উত্থাপন করেছে, কারণ এটি সমৃদ্ধ শ্রেণীর অতিরিক্ততা ও পিতৃতান্ত্রিক শাসনের সমালোচনা করে, যা ‘ট্রায়াঙ্গল অফ স্যাডনেস’ ও ‘সল্টবার্ন’ এর মতো সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রের তুলনায় আরও সরাসরি আক্রমণাত্মক।
বার্লিনে অনুষ্ঠিত বিশ্বপ্রিমিয়ারটি শিল্প জগতের নজরে আনা হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সাহী ও শিল্পকর্মের সমালোচকরা উপস্থিত ছিলেন। চলচ্চিত্রটি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক উৎসবে অংশগ্রহণের পাশাপাশি, বিশ্বব্যাপী বিতরণ পরিকল্পনা করা হয়েছে।
‘রোজবুশ প্রুনিং’ এর মাধ্যমে ক্যারিম আইনৌজ সমসাময়িক সমাজের ধনী শ্রেণীর নৈতিক অবক্ষয় ও পারিবারিক গঠনকে প্রশ্নের মুখে রাখছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই কাজটি দর্শকদের মধ্যে ক্ষমতার কাঠামো ও পারিবারিক সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন ঘটাবে। চলচ্চিত্রের প্রকাশনা ও বিতরণ সংক্রান্ত তথ্য শীঘ্রই প্রকাশিত হবে, যা দর্শকদের জন্য নতুন দৃষ্টিকোণ প্রদান করবে।



