নিপাহ ভাইরাস একটি বিরল কিন্তু প্রাণঘাতী রোগ, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ‑পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে, বিশেষত বাংলাদেশে, সময়ে সময়ে সঙ্কটের রূপ নেয়। এই রোগটি প্রাণী থেকে মানুষে ছড়ায় এবং মৃত্যুহার উচ্চ হওয়ায় সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ অপরিহার্য।
বৈজ্ঞানিকভাবে নিপাহ ভাইরাসের প্রাকৃতিক হোস্ট হল ফলভোজী বাদুড়, যাকে ফ্লাইং ফক্সও বলা হয়। বাদুড়ের লালা, মল বা রক্তের মাধ্যমে ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে, এবং শূকর বা অন্যান্য মাংসাশী প্রাণীর সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে এলে সংক্রমণ ঘটতে পারে।
খাদ্য মাধ্যমেও সংক্রমণ সম্ভব; বিশেষ করে কাঁচা খেজুরের গুড়, পাম স্যাপ বা আংশিক খাওয়া ফল যা বাদুড়ের লালায় দূষিত হয়েছে। কিছু সঙ্কটে রোগী থেকে রোগীতে, বিশেষত ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সদস্য ও স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে সংক্রমণ দেখা গেছে, যা মানব‑মানব সংক্রমণের সম্ভাবনা নির্দেশ করে।
সংক্রমণের পর উপসর্গ সাধারণত ৪ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে প্রকাশ পায়, যদিও কখনো কখনো দেরি করে দেখা দিতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে জ্বর, মাথাব্যথা, পেশী ব্যথা, গলা ব্যথা, কাশি, বমি বা শ্বাসকষ্টের মত ফ্লু‑সদৃশ লক্ষণ দেখা যায়, যা রোগের প্রাথমিক সনাক্তকরণকে কঠিন করে তুলতে পারে।
রোগ অগ্রসর হলে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। ঘুমের অস্বাভাবিকতা, মাথা ঘোরা, বিভ্রান্তি, চেতনা পরিবর্তন, খিঁচুনি বা সিজার মতো গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) হলে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোমায় পতিত হতে পারে।
পূর্বের সঙ্কটগুলোতে মৃত্যুহার ৪০ % থেকে ৭৫ % পর্যন্ত রেকর্ড হয়েছে; এই পার্থক্য মূলত রোগীর যত দ্রুত সহায়তা পায় এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় তার ওপর নির্ভর করে।
যদি জ্বরের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট বা স্নায়ুজনিত উপসর্গ দেখা দেয়, বিশেষত বাদুড়, রোগে আক্রান্ত প্রাণী, কাঁচা খেজুরের গুড় বা সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শের পর, অবিলম্বে চিকিৎসা কেন্দ্রে যাওয়া উচিত। প্রাথমিক সহায়তা, যথাযথ তরল সরবরাহ, অক্সিজেন থেরাপি এবং শ্বাসযন্ত্রের যত্ন রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়।
নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধের জন্য কিছু মৌলিক পদক্ষেপ অনুসরণ করা দরকার। বাদুড়ের উপস্থিতি থাকা এলাকায় কাঁচা খেজুরের গুড় সংগ্রহ এড়িয়ে চলা, ফল ও শাকসবজি ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া, এবং পোষা প্রাণী বা শূকরের সঙ্গে সরাসরি স্পর্শের সময় গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করা কার্যকর। এছাড়া পাম স্যাপ সংগ্রহের সময় ঢাকনা ব্যবহার করে বাদুড়ের লালা রোধ করা উচিত।
বাড়িতে রোগীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকলে হাত ধোয়া, মুখোশ পরা এবং রোগীর ব্যবহৃত বেডডিং ও টয়লেটের পরিষ্কার‑পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবার সদস্যদের জন্য সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা মেনে চলা, যেমন রোগীর আলাদা কক্ষ রাখা এবং রোগীর বর্জ্য সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করা, রোগের বিস্তার রোধে সহায়ক।
জনস্বাস্থ্য সংস্থা সংক্রমিত ব্যক্তির পরিচিতি ট্র্যাকিং, সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সঙ্কট নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দ্রুত সনাক্তকরণ ও আইসোলেশন ব্যবস্থা রোগের বিস্তারকে সীমিত করতে পারে।
সর্বশেষে, নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়িয়ে এবং উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে আমরা এই রোগের প্রভাবকে কমাতে পারি। আপনার পরিবারে কোনো সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিতে ভুলবেন না, কারণ সময়মতো সমর্থনমূলক চিকিৎসা বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়।



