বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও তার ক্যান্সার গবেষণা শাখা আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা (IARC) সম্প্রতি একটি বিশাল বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, ২০২২ সালে বিশ্বজুড়ে নির্ণয় হওয়া ক্যান্সার রোগের প্রায় তৃতীয়াংশই এমন উপাদানের ফলে ঘটেছে যা নিয়ন্ত্রণ বা বাদ দেওয়া সম্ভব। এই গবেষণায় ১৮৫টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে ৩০টি ঝুঁকি উপাদান চিহ্নিত করা হয়েছে এবং মোট ৭.১ মিলিয়ন নতুন ক্যান্সার কেসকে প্রতিরোধযোগ্য হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৩৭ শতাংশ ক্যান্সার রোগের কারণ এমন শর্তের সঙ্গে যুক্ত যা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর মধ্যে ধূমপান এককভাবে সর্বোচ্চ অবদান রাখে, যা বিশ্বব্যাপী নতুন ক্যান্সার কেসের ১৫ শতাংশের জন্য দায়ী। সংক্রমণজনিত রোগ ১০ শতাংশ, আর অ্যালকোহল সেবন ৩ শতাংশের সমান।
গবেষণায় দেখা গেছে, শ্বাসযন্ত্র, পেট ও গর্ভাশয় ক্যান্সার মোট প্রতিরোধযোগ্য কেসের প্রায় অর্ধেক গঠন করে। ফুসফুসের ক্যান্সার প্রধানত ধূমপান এবং বায়ু দূষণের সঙ্গে যুক্ত। পেটের ক্যান্সার হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি সংক্রমণের ফলে বেশি দেখা যায়। গর্ভাশয় ক্যান্সার অধিকাংশই মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) সংক্রমণের ফল।
বায়ু দূষণ, বিশেষ করে সূক্ষ্ম কণিকা (PM2.5) ফুসফুসের ক্যান্সার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই বায়ু মান উন্নত করা এবং দূষণকারী উৎস কমানো ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সার কেসের অনুপাত ৪৫ শতাংশ, যেখানে নারীদের ক্ষেত্রে তা ৩০ শতাংশে সীমাবদ্ধ। এর পেছনে ধূমপান ও অ্যালকোহল সেবনের পার্থক্য, পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রের পরিবেশগত ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য।
বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে তামাক ও অ্যালকোহল ব্যবহার কমানো, বায়ু মান উন্নত করা, টিকাদান বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গ্রহণের মাধ্যমে ক্যান্সার রোগের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিশেষ করে HPV টিকাদান গর্ভাশয় ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি সংক্রমণ কমাতে অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপি, স্যানিটেশন উন্নতি এবং নিরাপদ খাবার সরবরাহের ব্যবস্থা জরুরি। এই ধরনের পদক্ষেপগুলো পেটের ক্যান্সার ঝুঁকি হ্রাসে সহায়তা করবে।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা এই ফলাফলের ভিত্তিতে দেশীয় নীতিনির্ধারকদের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোর করা, অ্যালকোহল বিক্রয় ও সেবন সীমাবদ্ধ করা, বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ গ্রহণ এবং টিকাদান প্রোগ্রাম বিস্তারের আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করেও ঝুঁকি উপাদানগুলো কমানো সম্ভব।
গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, যদি এই প্রতিরোধমূলক কৌশলগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে পরবর্তী দশকে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং লক্ষ লক্ষ পরিবার ক্যান্সার নির্ণয়ের মানসিক ও আর্থিক বোঝা থেকে মুক্তি পাবে। তাই সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
ক্যান্সার রোগের প্রতিরোধে বিজ্ঞান ও নীতি সমন্বয়ই মূল চাবিকাঠি। ব্যক্তিগত স্তরে ধূমপান ত্যাগ, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং টিকাদান গ্রহণের পাশাপাশি, সরকারী স্তরে পরিবেশগত ও স্বাস্থ্য নীতি শক্তিশালী করা প্রয়োজন। আপনি কি আপনার জীবনে এই পরিবর্তনগুলো আনার জন্য প্রস্তুত?



