রাশিয়া সরকারবিরোধী নেতা আলেক্সি নাভালনির ৪৭ বছর বয়সে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে সাইবেরিয়ার পেনাল কলোনি কারাগারে অপ্রত্যাশিতভাবে মৃত্যু ঘটে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে যে নাভালনির দেহে পাওয়া বিষটি ডার্ট ব্যাঙের প্রাকৃতিক অ্যালকালয়েড এপিবাটিডিন, যা ইকুয়েডরের বিষাক্ত ব্যাঙ থেকে সংগ্রহ করা হয়। এই তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্য রাশিয়া সরকারকে আন্তর্জাতিক রসায়নিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সংস্থার কাছে অভিযোগ দায়ের করেছে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবিসির মাধ্যমে জানিয়েছে যে নাভালনির দেহে সনাক্ত করা এপিবাটিডিন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রাকৃতিক বিষ, যা ডার্ট ব্যাঙের ত্বকে পাওয়া যায়। এই বিষটি মানবদেহে প্রবেশ করলে দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যাঘাত ঘটায় এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে এধরনের বিষের ব্যবহার রসায়নিক অস্ত্র কনভেনশনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
মিউনিখে অনুষ্ঠিত নিরাপত্তা সম্মেলনে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার রাশিয়া সরকারকে নাভালনির মৃত্যুর জন্য দায়ী করে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, নাভালনির কারাবন্দি অবস্থায় রাশিয়া সরকারই একমাত্র সংস্থা যার কাছে এমন বিষ ব্যবহার করার সুযোগ, উদ্দেশ্য এবং পদ্ধতি ছিল। কুপার রাশিয়া সরকারকে নাভালনিকে রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখার ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ করেন।
সেই একই সম্মেলনে কুপার নাভালনির বিধবা স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তার প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। তিনি নাভালনির পরিবারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন বাড়াতে আহ্বান জানান। এই সাক্ষাৎকারের পরে কুপার রাশিয়া সরকারকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে জবাবদিহি করতে বলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি সুইডেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস এবং জার্মানি রাশিয়া সরকারকে নাভালনির ওপর বিষ প্রয়োগের জন্য সমালোচনা করেছে। এই দেশগুলো রাশিয়া সরকারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করে এবং সংশ্লিষ্ট তদন্তের দাবি জানিয়েছে। একাধিক দেশের সমন্বিত চাপ রাশিয়া সরকারকে আন্তর্জাতিক ফোরামে ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য করতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থার (OPCW) কাছে রাশিয়া সরকারের সম্ভাব্য লঙ্ঘনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে যে এপিবাটিডিনের ব্যবহার রসায়নিক অস্ত্র কনভেনশনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং রাশিয়া সরকারকে এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে। OPCW-র তদন্তের ফলাফল রাশিয়া সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে পারে।
আলেক্সি নাভালনি রাশিয়ার অন্যতম সক্রিয় বিরোধী নেতা এবং দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি রাশিয়া প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কঠোর সমালোচক এবং দেশের অভ্যন্তরে ও বহির্ভূমিতে পুতিনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গণ্য হতেন। নাভালনির রাজনৈতিক কার্যক্রম ও তার সমর্থকদের সংগঠন রাশিয়া সরকারের জন্য দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাভালনির মৃত্যুর পর রাশিয়া সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক সমালোচনা তীব্রতর হয়েছে এবং রাশিয়া-পশ্চিমের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্য ও তার মিত্র দেশগুলো রাশিয়া সরকারকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে জবাবদিহি করতে চায়, যা ভবিষ্যতে রাশিয়ার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে। রাশিয়া সরকার এই অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করে এবং নাভালনির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিজস্ব তদন্ত চালিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে।
এই ঘটনার পর রাশিয়া সরকার ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে রসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক হিংসা সংক্রান্ত আলোচনার নতুন পর্যায় শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর রাশিয়া সরকারের ওপর বাড়বে এবং নাভালনির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উন্মোচনের জন্য আরও তদন্তের দাবি থাকবে। ভবিষ্যতে রাশিয়া সরকারকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তার নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে, নতুবা আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হতে পারে।



