যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী তেল নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকটের ফলে কিউবার রাস্তায় ঐতিহ্যবাহী পেট্রোল গাড়ির পরিবর্তে সরকার পরিচালিত বৈদ্যুতিক ত্রিচক্রযান দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। হাভানা শহরের আলামা পাড়া থেকে ইউজেনিও গেইনজা নামে এক চালক জানান, তিনি দিনে প্রায় ষোলোবার বার যাত্রী বহন করেন এবং এই গাড়িগুলোই এখন এলাকার একমাত্র চলাচলের মাধ্যম।
কিউবায় ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে রঙিন পুরনো গাড়ি দেখা যেত, তবে তেল সরবরাহের ধারাবাহিক ঘাটতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবরোধের ফলে গাড়ি চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন কিউবাকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য “অত্যন্ত গুরুতর ও অভাবনীয়” হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল, যা অবরোধকে আরও কঠোর করেছে। ফলে, সরকারিকভাবে চালু করা বৈদ্যুতিক রিকশা, যাকে স্থানীয়ভাবে “ইলেকট্রিক ত্রিচক্রযান” বলা হয়, এখন পরিবহন ব্যবস্থার মূল স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।
মারিয়া কারিদাদ গাঞ্জালেসের মতো বাসিন্দারা বলেন, রেশনিংয়ের সময়ে এই সরকারি গাড়িগুলোই সাশ্রয়ী বিকল্প, কারণ ব্যক্তিগত গাড়ির চালনা এখন আর্থিকভাবে সম্ভব নয়। গত সপ্তাহে কিউবা সরকার জ্বালানি সাশ্রয় এবং জরুরি সেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে একটি ব্যাপক রেশনিং পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে, বৈদ্যুতিক রিকশার ব্যবহার বাড়িয়ে জ্বালানি চাহিদা কমানো এবং নগর পরিবহনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা লক্ষ্য।
স্থানীয় বাসিন্দা বারাব্রো কাস্তানেদা যুক্তি দেন, নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে এই পরিবর্তনই কিউবাকে গতিশীল রাখছে। তিনি বলেন, “যদি এই রিকশা না থাকত, আমরা সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে যেতাম।” তার কথায় স্পষ্ট যে, বিদ্যুৎ চালিত গাড়ি কেবল পরিবহন নয়, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের প্রভাবকে লাতিন আমেরিকায় শক্তি নিরাপত্তা ও জ্বালানি স্বনির্ভরতার প্রশ্নের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। একই সময়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু সদস্য দেশ কিউবার নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, যা কিউবাকে বৈদ্যুতিক যানবাহনের অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসনের নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে; যদি নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়, তেল সরবরাহ পুনরায় শুরু হতে পারে, তবে তা পর্যন্ত বৈদ্যুতিক রিকশা কিউবার নগর পরিবহনের মূল ভিত্তি হিসেবে থাকবে।
ভৌগোলিকভাবে, হাভানা ও তার পার্শ্ববর্তী শহরগুলোতে বৈদ্যুতিক রিকশার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যা শহরের ট্র্যাফিক জ্যাম কমাতে এবং বায়ু দূষণ হ্রাসে সহায়তা করছে। সরকার আগামী ত্রৈমাসিকে রিকশার ব্যাটারি রিচার্জিং স্টেশন নেটওয়ার্ক বিস্তারের পরিকল্পনা করেছে, যাতে দীর্ঘ দূরত্বের রুটেও গাড়িগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে পারে। এই উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গে, কিউবা আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।
কিউবায় বৈদ্যুতিক রিকশার উত্থানকে অন্যান্য দেশেও নজরদারির দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে ভেনেজুয়েলা ও ইরানে যেখানে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও জ্বালানি সংকটের মুখে সরকারিকভাবে বৈদ্যুতিক পরিবহনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এই তুলনা কিউবার নীতি গঠনে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত সমর্থনের ভূমিকা তুলে ধরছে।
পরবর্তী কয়েক মাসে কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য কূটনৈতিক আলোচনার সময়সূচি নির্ধারণের পরিকল্পনা করছে, যেখানে অবরোধের শর্তাবলী ও জ্বালানি সরবরাহের পুনরায় শুরু নিয়ে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে, কিউবার সরকার জাতিসংঘের মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত বৈঠকে এই রিকশা প্রকল্পের সাফল্য তুলে ধরতে চায়, যাতে আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সমর্থন অর্জন করা যায়।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের তেল অবরোধের ফলে কিউবায় গাড়ি চালানোর পদ্ধতি মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে; সরকারিকভাবে চালু করা বৈদ্যুতিক রিকশা এখন নাগরিকদের দৈনন্দিন চলাচলের প্রধান মাধ্যম এবং দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভবিষ্যতে অবরোধের শর্তাবলীর পরিবর্তন বা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রিকশা নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কিউবার পরিবহন ও অর্থনীতির পুনর্গঠনে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা নজরে থাকবে।



