আলাঁ গোমিসের নতুন চলচ্চিত্র ‘ডাও’ বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (বেরলিনেলিনে) প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছে। ফিল্মটি তিন ঘণ্টা পাঁচ মিনিটের দীর্ঘতা নিয়ে দুইটি ভিন্ন সংস্কৃতির অনুষ্ঠানকে একসঙ্গে উপস্থাপন করে। গল্পটি ফ্রান্সের গ্রামীণ প্রান্তে একটি বিবাহ এবং গিনি-বিসাউয়ের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানকে সমান্তরালে দেখায়।
গোমিসের জন্মফল দুই মহাদেশে ভাগ করা; তার মা ফ্রান্সের নাগরিক এবং তিনি ফ্রান্সে বড় হয়েছেন, আর তার বাবা গিনি-বিসাউয়ের মূল বাসিন্দা। এই দ্বৈত পরিচয় তার চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রায়শই প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি ফরাসি চলচ্চিত্র শিক্ষা গ্রহণের পর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ল’আফ্রান্স’ (L’Afrance) তৈরি করেন, যা অভিবাসী জীবনের বাস্তবতা তুলে ধরেছে।
এরপর গোমিসের ‘ফেলিসিটে’ (Félicité) ২০১৭ সালে বার্লিন ফেস্টিভ্যালে সিলভার বের পুরস্কার জিতেছিল এবং ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোর গায়িকা চরিত্রের মাধ্যমে সামাজিক বাস্তবতা চিত্রিত করেছিল। ‘ডাও’ তার পূর্বের কাজের ধারাবাহিকতা হিসেবে দুই মহাদেশের সংযোগকে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করে।
‘ডাও’তে দুইটি অনুষ্ঠান একসাথে ঘটার মাধ্যমে ফ্রান্স ও গিনি-বিসাউয়ের সংস্কৃতির পারস্পরিক সম্পর্ককে দৃশ্যমান করা হয়েছে। চলচ্চিত্রের দৃশ্যাবলী উভয় দেশের প্রকৃতি, লোকসঙ্গীত এবং রীতিনীতি দিয়ে সমৃদ্ধ। গোমিস নিজে তার পারিবারিক সদস্যদেরও কাস্টে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যা বাস্তবতা ও কল্পনার সীমানা ম্লান করে।
কাস্টে কেটি কোরো, ডি’জোয়ে কোয়াডিও, সামির গেসমি, মাইক ইটিয়েন, নিকোলাস গোমিস, ফারা বাকো গোমিস এবং পাউন্ডো গোমিস সহ বেশ কয়েকজন ফরাসি অভিনেতা এবং স্থানীয় অপ্রশিক্ষিত পারফর্মার রয়েছে। পারিবারিক সদস্যদের উপস্থিতি দৃশ্যে স্বাভাবিকতা যোগায় এবং দর্শকের কাছে একধরনের সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
ফিল্মটি প্রচলিত বর্ণনামূলক কাঠামো থেকে বিচ্যুত হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটমান দৃশ্যের ধারায় গড়ে উঠেছে। স্ক্রিপ্টের পরিবর্তে অধিকাংশ অংশে অভিনেতারা বাস্তব সময়ে তাদের চরিত্রে নিমজ্জিত হয়। এই পদ্ধতি চলচ্চিত্রকে ডকুমেন্টারি এবং নাটকের মিশ্রণ হিসেবে উপস্থাপন করে, যেখানে সত্যিকারের মুহূর্তগুলোকে নাট্যিক রঙে রাঙানো হয়েছে।
তিন ঘণ্টারও বেশি সময়ের দীর্ঘতা এবং স্পষ্ট প্লটের অনুপস্থিতি দর্শকদের ধৈর্য পরীক্ষা করতে পারে। গল্পের প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে ঘটতে থাকলেও কোনো নির্দিষ্ট শীর্ষবিন্দু বা ক্লাইম্যাক্সের অভাব রয়েছে। ফলে কিছু দর্শকের জন্য এটি মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে, যদিও কিছু অংশে স্বতন্ত্র স্বাদ এবং প্রামাণিকতা বজায় থাকে।
‘ডাও’ বার্লিন ফেস্টিভ্যালের মূল প্রতিযোগিতায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচক ও শিল্পকর্মের প্রেমিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গোমিসের পরিচালক ও চিত্রনাট্যকারের দ্বৈত ভূমিকায় কাজ করা চলচ্চিত্রটি তার স্বকীয় শৈলীর প্রতিফলন। ফেস্টিভ্যালের প্রোগ্রাম তালিকায় এই কাজের উপস্থিতি তার শিল্পগত গুরুত্বকে আরও দৃঢ় করে।
ফিল্মের মূল থিম হল দুই সংস্কৃতির মিলন ও পারস্পরিক বোঝাপড়া। দু’টি ভিন্ন পরিবেশে একই সময়ে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানগুলো সামাজিক বন্ধন, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং পরিচয়ের সন্ধানকে প্রকাশ করে। গোমিসের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক ইতিহাসকে ক্যানভাসে রূপান্তরিত করে চলচ্চিত্রটি একটি সাংস্কৃতিক সেতু হিসেবে কাজ করে।
চলচ্চিত্রের কিছু অংশে স্বাভাবিকতা ও আন্তরিকতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে, যা দর্শকের কাছে গভীর প্রভাব ফেলে। তবে দীর্ঘ সময়ের পুনরাবৃত্তি এবং নির্দিষ্ট নাটকীয় উত্তেজনার অভাব কখনো কখনো একঘেয়েমি সৃষ্টি করে। এই বৈপরীত্যই ‘ডাও’কে একটি অনন্য, তবে চ্যালেঞ্জিং কাজ হিসেবে উপস্থাপন করে।
বেরলিন ফেস্টিভ্যালে ‘ডাও’কে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং এটি গোমিসের ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা যায়। দর্শকদের জন্য এই চলচ্চিত্রটি একটি দীর্ঘ, স্বতঃস্ফূর্ত এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা প্রদান করে, যা দু’টি মহাদেশের সংযোগকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করে।



