কাঠমান্ডু, ১৩ ফেব্রুয়ারি – নেপালের রাজধানীতে হাজারো সমর্থক একত্রিত হয়ে গ্যাণেন্দ্র রাজা, যিনি তিন মাসের বিদেশি সফর শেষ করে দেশে ফিরে এসেছেন, তাকে স্বাগত জানালেন। বিমানবন্দর থেকে বাসভবনে গিয়ে তার গাড়ির চারপাশে ভিড়ের উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছিল, যেখানে “রাজা ফিরে আসুন, দেশকে বাঁচান” স্লোগান গুঞ্জরিত হচ্ছিল।
গত সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভে জেন-জি তরুণদের নেতৃত্বে ৭৭ জনের মৃত্যু ঘটায়, যা সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে এবং প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলিকে পদত্যাগে বাধ্য করে। একই বছরই নতুন সংসদীয় নির্বাচনের তারিখ ৫ মার্চ ঘোষণা করা হয়, যা দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত।
২০০৮ সালে বিশেষ আইনসভার মাধ্যমে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে নেপালকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করা হয়। তবু গ্যাণেন্দ্র, ৭৮ বছর বয়সী, এখনো কাঠমান্ডুর ব্যক্তিগত বাসভবনে সাধারণ নাগরিক হিসেবে বসবাস করছেন। তার সমর্থকরা দাবি করেন, একমাত্র রাজা পুরো নেপালি জনগণের অভিভাবক হতে পারেন, কারণ বর্তমান রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতি ও অক্ষমতা দেখা যাচ্ছে।
সনাতন প্রসাদ রেগমি, ৫৫ বছর বয়সী একজন সমর্থক, সমাবেশে বলেন, “রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যাতে দেশের শাসন স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত হয়।” তার মতামত দেশের বৃহত্তর অংশে শেয়ার করা হয়েছে, যেখানে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বর্তমান সরকারের প্রতি হতাশা বাড়ছে। তারা দাবি করে, শাসকগোষ্ঠী উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
গত অর্ধদশকে নেপালে মোট ১৪ বার সরকার পরিবর্তন হয়েছে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলেছে। এই অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নড়বড়ে করেছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা স্পষ্ট না হয়, তবে দেশের আর্থিক অবস্থা আরও অবনতি হতে পারে।
নতুন নির্বাচনে ২৭৫টি আসনের জন্য ৬৫টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, যার মধ্যে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে একটি দলও রয়েছে। এই দলটি ঐতিহ্যবাহী রাজতান্ত্রিক শক্তির পুনরুজ্জীবনকে লক্ষ্য করে, যদিও তাদের ভোটের সম্ভাবনা এখনও অনিশ্চিত।
প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে দুইজন নতুন মুখের উত্থান বিশেষ দৃষ্টিগোচর। র্যাপার থেকে কাঠমান্ডুর মেয়র হওয়া বালেন্দ্র শাহ এবং সাবেক টিভি উপস্থাপক রবি লামিচানে এখন রাজনৈতিক মঞ্চে সক্রিয়। উভয়েই তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে আধুনিক যোগাযোগ কৌশল ব্যবহার করছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ভোটার ভোটাধিকার ব্যবহার করতে পারবেন। ভোটার তালিকায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পর প্রায় এক মিলিয়ন নতুন নাম যুক্ত হয়েছে, যা নির্বাচনের বৈধতা ও অংশগ্রহণ বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজা গ্যাণেন্দ্রের সমাবেশে উপস্থিত জনতা জাতীয় পতাকা নেড়ে, ফুলের তোড়া দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানায়। সমাবেশের পরিবেশে ঐতিহ্যবাহী নেপালি সঙ্গীত ও নৃত্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা সমর্থকদের ঐতিহাসিক সংযোগকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়।
অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করেন, যদি রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়, তবে তা নেপালের রাজনৈতিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে নেপালের মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের প্রতি প্রশ্ন তোলা হতে পারে।
নেপালের বর্তমান সরকার, যদিও নতুন নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তবু অর্থনৈতিক নীতি ও সামাজিক কল্যাণ প্রকল্পে ত্বরান্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। তারা বলেছে, নির্বাচনের পর দ্রুত স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নমূলক কাজ চালিয়ে যাওয়া হবে, যাতে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায়।
সারসংক্ষেপে, গ্যাণেন্দ্র রাজা ও তার সমর্থকদের সমাবেশ নেপালের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন এক মোড়ের সূচনা নির্দেশ করে। মার্চে নির্ধারিত সংসদীয় নির্বাচন দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের মূল মুহূর্ত হবে, যেখানে রাজতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন, নতুন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উত্থান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা সবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসবে।



