ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস ১৪ ফেব্রুয়ারি শনিবার ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৮ সালের পর থেকে এই নির্বাচনকে সবচেয়ে স্বচ্ছ এবং গ্রহণযোগ্য হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
ইজাবসের মতে, এই নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গিয়েছে, যা ভোটারদের জন্য বিস্তৃত বিকল্প সরবরাহ করেছে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাজের সময় তারা স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করেছে, যা ফলাফলের বৈধতা নিশ্চিত করেছে।
তবে, ইজাবস নির্বাচনী প্রচারণার সময় নারীদের ওপর সহিংসতা ঘটার বিষয়েও সতর্কতা প্রকাশ করেন। তিনি জানিয়ে দেন, পর্যবেক্ষণ দল ২৭টি জেলায় মোট ২০০টি স্থানে নারীর ওপর আক্রমণের অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে। এই ধরনের ঘটনা নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করেছে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার ন্যায়বিচারকে ক্ষুণ্ন করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ইজাবসের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে, নারী প্রার্থীদের সংখ্যা এবং তাদের পারফরম্যান্সের তুলনায় এই ধরনের হিংসা বিশেষভাবে দুঃখজনক। তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় নারীদের হারিয়ে যাওয়া ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সমতা অর্জনের পথে একটি বড় বাধা হতে পারে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ইজাবসের মন্তব্যের পর, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে। আওয়ামী লীগ, যা সরকার গঠন করে, ইজাবসের ইতিবাচক মূল্যায়নকে স্বাগত জানিয়ে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার বজায় রাখার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রচেষ্টাকে প্রশংসা করে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো নির্বাচনের সময় ঘটিত হিংসা ও নারীদের ওপর আক্রমণকে কঠোরভাবে নিন্দা করে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষণ দল নির্বাচনের সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মূল্যায়ন করেছে, তবে তারা উল্লেখ করেছে যে নির্বাচনী প্রচারণার সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা বিশেষত নারীদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ইজাবসের মতে, এই ধরনের সমস্যার সমাধান না হলে ভবিষ্যতে নির্বাচনের গুণগত মান হ্রাস পেতে পারে।
ইজাবসের মন্তব্যের পর, নির্বাচন কমিশনও তাদের কাজের স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য গৃহীত পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দেন। তারা বলেছে, নির্বাচনের সময় সকল প্রার্থীর সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং ভোটার তালিকা, ভোট গোনার প্রক্রিয়া ও ফলাফল ঘোষণায় কোনো অনিয়ম না থাকা নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া, তারা নির্বাচনী হিংসা প্রতিরোধে স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
বিশ্লেষকরা ইজাবসের মন্তব্যকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখছেন। তারা উল্লেখ করেন, স্বচ্ছ নির্বাচন এবং স্বাধীন কমিশনের উপস্থিতি দেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতি বাড়াবে, তবে নারীদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পূর্ণতা অর্জন কঠিন হবে।
অবশেষে, ইজাবসের মন্তব্য ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য একটি রোডম্যাপ সরবরাহ করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হিংসা রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত, যাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে রাজনৈতিক মঞ্চে অংশ নিতে পারে। এছাড়া, নির্বাচন কমিশনের স্বতন্ত্রতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই মূল্যায়ন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে, যেখানে স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা একসঙ্গে বিবেচনা করা হবে। নির্বাচনের ফলাফল ও পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথের ওপর এই মন্তব্যের প্রভাব সময়ের সাথে স্পষ্ট হবে।



