আর্জেন্টিনার গ্রাম্য প্রান্ত থেকে বুয়েনস আইরেসের রেলপথে এক যাত্রা, ‘দ্য রিভার ট্রেন’ (El Tren Fluvial) ১৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথমবারের জন্য বিশ্বপ্রিমিয়ার পেল। উৎসবের প্রথম ফিচারসের ‘পারস্পেকটিভস’ বিভাগে এই চলচ্চিত্রটি উপস্থাপিত হয়, যা তরুণ নির্মাতাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার লক্ষ্য রাখে।
চলচ্চিত্রটির পরিচালনা কাজ লোরেঞ্জো ফেরো এবং লুকাস এ. ভিগনালে একসাথে করেছেন। ফেরো আগে ‘এল এঞ্জেল’, ‘সাইমন অফ দ্য মাউন্টেন’ এবং নেটফ্লিক্সের ‘নারকোস’ সিরিজে অভিনয় করে পরিচিত ছিলেন, আর ভিগনালে সঙ্গীত ভিডিও ও বিজ্ঞাপন দিগন্তে তার নাম গড়ে তুলেছেন। দুজনের সহযোগিতা ‘লা পাসিয়ন’ শিরোনামের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে শুরু হয়, যা থেকে তারা পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রকল্পে একসাথে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন।
‘দ্য রিভার ট্রেন’ একটি কিশোর-কিশোরীর আত্ম-অন্বেষণ গল্প, যেখানে নয় বছর বয়সী মিলো নামের ছেলেটি প্রধান চরিত্র। মিলোকে গাউচোদের ঐতিহ্যবাহী পুরুষ নৃত্য ‘মালাম্বো’ তে পারদর্শী হতে চায় তার পরিবার, এবং সে একই সঙ্গে আদর্শ পুত্রের ভূমিকা পালন করতে বাধ্য। তার দৈনন্দিন জীবনে বাসন ধোয়া, রান্না করা এবং রাতে নৃত্য অনুশীলন করা অন্তর্ভুক্ত, যা তাকে স্বপ্নের পথে বাধা দেয়।
মালাম্বো নৃত্যটি আর্জেন্টিনার প্রাচীন গাউচো সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে পুরুষ নর্তকরা দ্রুত পা ও জটিল পা-চলন দিয়ে মঞ্চে ছাপ ফেলেন। এই নৃত্যটি শারীরিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক, এবং মিলোর জন্য এটি নিজের পরিচয় গড়ার একটি মাধ্যম। তবে তার স্বপ্ন কেবল নৃত্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সে রেলগাড়িতে চড়ে বুয়েনস আইরেসের বিশাল শহরে পৌঁছানোর কল্পনা করে, যেখানে সে নতুন জীবনের স্বাদ নিতে চায়।
মিলোর স্বপ্নের পথে বাধা হল তার পরিবার ও গ্রাম্য পরিবেশের সীমাবদ্ধতা। তার মায়ের কাজের চাপ, বাবার প্রত্যাশা এবং গ্রাম্য জীবনের রুটিন তাকে প্রায়ই সীমাবদ্ধ করে রাখে। তাই সে নিজেকে মুক্ত করার জন্য এক ধরণের আত্ম-অন্বেষণের যাত্রা শুরু করে, যেখানে একা পথে চলা এবং অপরিচিত শহরের অজানা আনন্দ-দুঃখের মুখোমুখি হওয়া অন্তর্ভুক্ত।
চলচ্চিত্রে মিলোকে অভিনয় করেছেন নন-প্রফেশনাল অভিনেতা মিলো বার্রিয়া, যিনি নিজের নামের চরিত্রে আত্মসাৎ করে বাস্তবতা ও কল্পনার সীমানা মুছে ফেলেছেন। তার পারফরম্যান্সে গ্রাম্য শিশুর সরলতা ও স্বপ্নের তীব্রতা উভয়ই স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এছাড়া রিটা পলস, ফাবিয়ান কাসাস এবং অন্যান্য তরুণ অভিনেতাদের সমন্বয়ে গঠিত কাস্টটি গল্পের আবহকে সমৃদ্ধ করে।
‘দ্য রিভার ট্রেন’কে একটি ধ্যানমগ্ন, স্বপ্নময় যাত্রা হিসেবে বর্ণনা করা যায়, যেখানে বাস্তব জীবনের কঠিনতা ও কল্পনার উড়ান একসাথে মিশে যায়। চলচ্চিত্রের দৃশ্যাবলি আর্জেন্টিনার প্রাকৃতিক দৃশ্য, রেলপথের ধূসর ধোঁয়া এবং বুয়েনস আইরেসের ব্যস্ত শহরের রঙিন রঙের মিশ্রণ, যা দর্শকের মনোযোগকে আকর্ষণ করে।
চলচ্চিত্রের নির্মাণে আর্জেন্টিনার সিনেমাটিক ঐতিহ্যের উল্লেখযোগ্য রেফারেন্স দেখা যায়; পুরনো চলচ্চিত্রের দৃশ্যাবলি, ক্লাসিক সাউন্ডট্র্যাক এবং স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতীকী উপাদানগুলোকে সূক্ষ্মভাবে সংযোজন করা হয়েছে। এই উপাদানগুলো মিলোয়ের স্বপ্নের পথে তার পরিচয় গঠনে সহায়তা করে, এবং দর্শকদেরকে দেশের সমৃদ্ধ চলচ্চিত্র ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
বার্লিনের ‘পারস্পেকটিভস’ বিভাগে এই চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রথম ফিচারসের অংশ হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় এটি তরুণ পরিচালকদের সৃজনশীলতা ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ পেয়েছে। উৎসবের দর্শকরা আর্জেন্টিনার গ্রাম্য জীবন, নৃত্য সংস্কৃতি এবং শহুরে স্বপ্নের সংমিশ্রণকে প্রশংসা করেছেন।
‘দ্য রিভার ট্রেন’ কেবল একটি কিশোরের স্বপ্নের গল্প নয়; এটি সামাজিক প্রত্যাশা, পরিবারিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মধ্যে সংঘর্ষের প্রতিচ্ছবি। মিলোর যাত্রা দর্শকদেরকে নিজের স্বপ্ন অনুসরণ করার পথে বাধা ও সুযোগ নিয়ে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে। চলচ্চিত্রের শেষাংশে যে অনিশ্চয়তা ও মুক্তি প্রকাশ পায়, তা দর্শকের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।
সারসংক্ষেপে, লোরেঞ্জো ফেরো ও লুকাস ভিগনালের যৌথ সৃষ্টিকর্ম ‘দ্য রিভার ট্রেন’ বার্লিনের বড় মঞ্চে আর্জেন্টিনার সংস্কৃতি, নৃত্য এবং স্বপ্নের গল্পকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছে। গ্রাম্য পরিবেশের সরলতা ও শহরের বিশালতা একসাথে মিশে একটি অনন্য চলচ্চিত্র অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে, যা আন্তর্জাতিক দর্শকদের মনোযোগের যোগ্য।



