বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নওগাঁ জেলার আদালপুর গ্রামে রাতের অন্ধকারে এক অস্বাভাবিক আলো দেখা যায়। ১০,০০০টি LED বাতি ড্রাগন ফলের গাছকে কৃত্রিম দিনের আলো প্রদান করে, ফলে লাল রঙের ফলগুলো সবুজ শাখায় ভারীভাবে ঝুলে থাকে। এই ব্যবস্থা প্রয়োগকারী হলেন আবুল কালাম আজাদ, যিনি পূর্বে গ্রামীণ বিদ্যুৎ প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন এবং বিদ্যুৎকে শুধুমাত্র গৃহস্থালির জ্বালানি নয়, কৃষি উৎপাদনের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করার ধারণা গড়ে তোলেন।
আজাদের তিনটি ড্রাগন ফলের বাগান সাপাহার উপজেলা, মোট ৪৫ বিঘা জমিতে বিস্তৃত, যার আনুমানিক ন্যূনতম বাজারমূল্য চার কোটি টাকা। রাতভর আলো জ্বালিয়ে গাছকে বছরের যে কোনো সময় ফল উৎপাদনে উদ্দীপিত করা হয়। এই পদ্ধতি সফল হয়েছে; তিনি বছরে প্রায় ৩০০ টন ফল সংগ্রহ করেন এবং দুই কোটি টাকার বেশি মুনাফা অর্জন করেন। দশ বছর আগে বাংলাদেশে ড্রাগন ফলের চাষ প্রায় অদৃশ্য ছিল, আজ তা উল্লেখযোগ্য আয় সৃষ্টি করছে।
ড্রাগন ফলের সফলতা কেবল এক উদাহরণ; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদেশি ফলের চাষ দ্রুত বাড়ছে। অ্যাভোকাডো, থাই গুআবা, পাপায়া, আনারসের মতো এক্সোটিক ফল এখন স্থানীয় মাটিতে ফল দিচ্ছে এবং সারা বছর বাজারে পাওয়া যায়। এই প্রবণতা স্থানীয় ফলের সরবরাহকেও স্থিতিশীল করেছে, ফলে পাপায়া ও আনারসের মতো ফলের মৌসুমী ঘাটতি কমে গেছে।
ফলচাষের লাভজনকতা স্পষ্ট হওয়ায় অনেক কৃষক ঐতিহ্যবাহী শস্যের বদলে ফলের বাগানে বিনিয়োগ করছেন। এই পরিবর্তনের পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দশ বছরের দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প। ২০১৫ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত চালু ‘বছরব্যাপী ফল উৎপাদন ও পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প’ দেশের ফলের উৎপাদনকে সারা বছর উপলব্ধ করার লক্ষ্যে কাজ করেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় ফল উৎপাদন FY09 অর্থবছরে ১.০৩ কোটি টন থেকে FY25-এ ১.৫১ কোটি টনে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ফলচাষের জন্য ব্যবহৃত জমির পরিমাণ ৯.৩৫ লাখ হেক্টর থেকে কমে ৭.৭৯ লাখ হেক্টরে নেমে এসেছে। উৎপাদন দক্ষতার এই উন্নতি ফলের পরিমাণ বাড়িয়ে তুললেও জমির ব্যবহার কমিয়ে আয় বৃদ্ধি করেছে।
ম্যাংগো উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গেছে; FY13-এ ১৫ লাখ টন থেকে এখন প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৩০ লাখ টনের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফলের উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানি সম্ভাবনা এবং দেশীয় বাজারের মূল্য স্থিতিশীলতা উন্নত হয়েছে। ফলে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পেয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ড্রাগন ফলের LED আলোয় চাষের মডেলটি এখন অন্যান্য ফলের জন্যও প্রয়োগের পর্যায়ে রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে কৃষকদের নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত করছে। ফলচাষের এই আধুনিক পদ্ধতি কৃষি উৎপাদনের বৈচিত্র্য বাড়িয়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাজারে এক্সোটিক ফলের চাহিদা বাড়ার ফলে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ছে, যা আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আয়াতের ব্যয় হ্রাসে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে, ফলের মূল্য স্থিতিশীলতা গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি করবে।
তবে দ্রুত বর্ধনশীল ফলচাষের সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। অতিরিক্ত LED আলো ব্যবহার ও উচ্চ শক্তি খরচের ফলে পরিবেশগত প্রভাব বাড়তে পারে। এছাড়া, একচেটিয়া ফলের ওপর নির্ভরতা বাজারের দোলন বাড়িয়ে কৃষকদের আয়কে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তাই টেকসই চাষ পদ্ধতি ও বৈচিত্র্যপূর্ণ ফসলের সমন্বয় প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে, ড্রাগন ফলের LED আলোয় চাষের উদাহরণ দেখায় যে প্রযুক্তি ও সরকারি সমর্থন মিলিয়ে কৃষি খাতে নতুন ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তোলা সম্ভব। ফল উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ও উচ্চ মুনাফা কৃষকদের নতুন বিনিয়োগের দিকে আকৃষ্ট করছে, যা দেশের কৃষি কাঠামোকে আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
ভবিষ্যতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকল্পের বিস্তৃতি এবং বাণিজ্যিক ফলচাষের সমন্বয় দেশের রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়াবে এবং গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি করবে। তবে পরিবেশগত দায়িত্ব এবং বাজারের ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য নীতি-নির্ধারকদের সতর্ক পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সংক্ষেপে, LED আলোয় ড্রাগন ফলের চাষের সফলতা দেশের ফল উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা কৃষি খাতের আয় বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ এবং রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



