কিউবা রাজধানী হাভানার নিকো লোপেজ তেল শোধনাগারে শুক্রবার অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, তবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই আগুন নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। শোধনাগারে কোনো কর্মী আহত হয়নি এবং ঘটনাটি দেশের তীব্র জ্বালানি ঘাটতির প্রেক্ষাপটে ঘটেছে।
বিবিসি সূত্রে জানানো যায়, শোধনাগারের ধোঁয়া গাঢ় কালো রঙের ছিল এবং হাভানা বে-তে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। অগ্নিকাণ্ডের তীব্রতা সত্ত্বেও দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়, যা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপের ফলাফল।
কিউবার জ্বালানিমন্ত্রী অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত শুরু হওয়ার কথা জানিয়ে দেন এবং উল্লেখ করেন যে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। তদন্তে আগুনের মূল কারণ নির্ণয় এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা রোধের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হবে।
অগ্নিকাণ্ডের স্থানটির কাছাকাছি হাভানা বে-তে দুইটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার নোঙর করে রাখা ছিল, যা জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ট্যাঙ্কারগুলো অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় বলে বলা হচ্ছে, তবে তাদের উপস্থিতি পরিস্থিতি জটিল করেছে।
কিউবা দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জ্বালানি সংকটে ভুগছে, যার মূল কারণ মার্কিন সরকারের চাপের ফলে ভেনেজুয়েলা সরকার থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই নিষেধাজ্ঞা দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত করেছে।
গত মাসের শুরুর দিকে মার্কিন সেনারা সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে রাজধানী কারাকাস থেকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলা সরকার কিউবায় গড়ে ৩৫,০০০ ব্যারেল তেল পাঠাতো বলে ধারণা করা হয়। এই সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় জ্বালানি ঘাটতি তীব্রতর হয়েছে।
মার্কিন সরকার ভেনেজুয়েলা সরকারের তেল ট্যাঙ্কারগুলো জব্দ করে কিউবায় জ্বালানি প্রবাহ আরও সীমিত করেছে। ট্যাঙ্কার জব্দের ফলে কিউবার বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শিল্পখাতে তেল সরবরাহের বিকল্প কমে গেছে।
ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলা তেল বিক্রি করা দেশগুলোকে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি জানিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই পদক্ষেপগুলো কিউবার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কিউবান নেতাদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, চুক্তি না করলে পরিণতি ভোগ করতে হবে। এই রকম কঠোর রেটোরিক কিউবার সরকারকে আলোচনার টেবিলে টেনে আনার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জ্বালানি ঘাটতির ফলে কিউবায় ব্যাপক লোডশেডিং শুরু হয়েছে, যা হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ডায়ালাইসিস কেন্দ্র এবং পানির পাম্পিং স্টেশনগুলোকে প্রভাবিত করছে। বিদ্যুৎ না থাকায় রোগীর চিকিৎসা ও মৌলিক সেবার ধারাবাহিকতা বিপন্ন হয়েছে।
বিমান জ্বালানির ঘাটতি বিমান সংস্থাগুলোকে হাভানায় তাদের ফ্লাইট স্থগিত করতে বাধ্য করেছে। যুক্তরাজ্যসহ বেশ কিছু দেশ নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছে। এই পরিস্থিতি কিউবার পর্যটন শিল্পকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
হাভানা বে-তে বৃহস্পতিবার মেক্সিকোর দুটি জাহাজ ৮০০ টন ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে, যা জ্বালানি ও মৌলিক পণ্যের ঘাটতি কমাতে সহায়তা করবে। মানবিক সহায়তা কিউবার জনগণের জন্য অল্প সময়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি এনে দিয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ভলকার টুর্ক উল্লেখ করেছেন, মার্কিন সরকারের কিউবার উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ‘একতরফা অর্থনৈতিক জবরদস্তির চরম রূপ’ হিসেবে বিবেচিত। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে এই ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের বিরোধী।
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধানের মতে, কিউবায় বাড়তে থাকা জ্বালানি সংকট এবং মানবিক জরুরি অবস্থার মধ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতি দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোকে ক্ষয়প্রাপ্ত করে তুলছে এবং তা দ্রুত সমাধান না হলে আরও গুরুতর মানবিক সংকটে পরিণত হতে পারে।



