ঢাকা শহরে আজ পহেলা ফাল্গুনের শুভেচ্ছা জানিয়ে বসন্তের আগমন চিহ্নিত হয়েছে। শীতের নিস্তেজতা দূর হয়ে বাতাসে নতুন রঙের ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে; শহরের বিভিন্ন পার্ক ও হ্রদে মানুষ রঙিন শাড়ি-সুটে সাজে, গাছের ডালে ফুটে থাকা পলাশ ও শিমুলের মিষ্টি গন্ধের সঙ্গে এই দিনটি শুরু হয়েছে।
বসন্তের প্রথম চিহ্ন হিসেবে গাছের শাখায় পলাশের লাল-গোলাপি ও শিমুলের সাদা-গোলাপি ফুল ফুটে উঠেছে। শীঘ্রই কোকিলের কুহু তান বাতাসে গুঞ্জরাবে বলে আশা করা যায়। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া ও নাগলিঙ্গমের উজ্জ্বল লাল-হলুদ রঙের গুচ্ছগুলো প্রকৃতিকে রঙিন ক্যানভাসে রূপান্তরিত করেছে।
প্রকৃতির রঙের সঙ্গে মানুষের মনও রঙিন হয়েছে। তরুণ-তরুণী ও বয়স্করা হলুদ, বাসন্তী ও অন্যান্য উজ্জ্বল রঙের শাড়ি, পাঞ্জাবি ও স্যুটে সজ্জিত হয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এই রঙিন পোশাকের ভিড় বসন্তের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে এবং শহরের রাস্তায় উৎসবের উল্লাস ছড়িয়ে দিয়েছে।
ইতিহাসের দিক থেকে বসন্তের উৎসবের গভীর শিকড় রয়েছে। ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা নববর্ষের গণনা শুরু করেন এবং ১৪টি ঐতিহ্যবাহী উৎসবের সূচনা করেন। এর মধ্যে বসন্ত উৎসবকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং ১৪০১ বঙ্গাব্দ থেকে এই উৎসবটি ধারাবাহিকভাবে পালন করা হয়ে আসছে।
বসন্তের মাসকে বাংলা ভাষা ও বইয়ের মাস হিসেবে গণ্য করা হয়। যদিও এই বছর বইমেলা না হলেও, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে রাজধানীতে, বসন্তের রঙে সজ্জিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানগুলোতে সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্য ও লোকশিল্পের মিশ্রণ দেখা যায়।
ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আজকের অনুষ্ঠানগুলো বিশেষভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বকুলতলা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, রমনা পার্ক, বনানী লেক, ধানমন্ডি লেক, রবীন্দ্র সরোবর ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ বহু স্থানেই দিনভর বিভিন্ন কার্যক্রম চলবে। প্রতিটি স্থানেই স্থানীয় ও জাতীয় শিল্পীদের পারফরম্যান্স, শিশু-কিশোরদের সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা এবং দলীয় ও একক আবৃত্তি দেখা যাবে।
অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ফুলের প্রীতি বন্ধনী বিনিময়, আদিবাসী নৃত্য ও গানের পরিবেশনা, একক ও দলীয় সংগীত, বাউল গানের সুরে বসন্তের মেজাজ বাড়ানো, এবং বিভিন্ন বয়সের অংশগ্রহণকারীদের জন্য রঙিন শোভাযাত্রা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমেও মানুষ মোবাইল, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদিতে বসন্তের শুভেচ্ছা বিনিময় করে, যা ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক উভয় দিককে একত্রিত করে।
বসন্তের এই উল্লাসের সময়ে, শহরের সব কোণে রঙিন সাজসজ্জা, সুরেলা সঙ্গীত ও প্রাণবন্ত নৃত্য দেখা যায়। অংশগ্রহণকারীরা একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপচারিতা করে, শৈল্পিক প্রতিভা উপভোগ করে এবং এই ঋতুর সৌন্দর্যকে হৃদয়ে গেঁথে রাখে।
বসন্তের রঙে রাঙা হয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনা ও মনোভাবও নতুন দৃষ্টিকোণ পায়। এই উৎসবের মাধ্যমে সামাজিক বিভাজন দূর করে, মানুষ একে অপরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে, বসন্তের এই আনন্দময় মুহূর্তগুলোকে সবার জন্য সমৃদ্ধি ও শান্তির বার্তা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
বসন্তের এই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে, শহরের মানুষ নতুন বছরের প্রত্যাশা নিয়ে একসাথে এগিয়ে চলেছে। রঙিন শাড়ি, সুরেলা সঙ্গীত ও ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানগুলোকে মিশিয়ে, পহেলা ফাল্গুনের এই দিনটি ঢাকার সাংস্কৃতিক জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।



