পশ্চিম তীরের বেশ কয়েকটি শহরে ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর সমন্বিত অভিযান চালানো হয়, যার ফলে অন্তত ৫৪ জন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছে। আক্রমণগুলো নাবলুসের দক্ষিণে তালফিট ও কুসরার নিকট, রামাল্লার নিকটবর্তী তুরমুস আয়া এবং জেনিনের জাবা, সিরিস ও মেইথালুন সহ বিভিন্ন গ্রামে ঘটেছে। গুলিবিদ্ধ একজনসহ গ্যাস ও কাঁদা ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তু এলাকায় বিস্তৃত হিংসা চালানো হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের মতে, এই আক্রমণগুলো একাধিক দিনে ধারাবাহিকভাবে সংঘটিত হয়েছে।
নাবলুসের দক্ষিণে তালফিট ও কুসরার কাছাকাছি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর সরাসরি গুলি চালায় এবং গ্যাস কাঁদা নিক্ষেপ করে। গুলিবিদ্ধ একজনের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন গ্যাসের শ্বাসকষ্টে ভুগেছেন, যা জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রয়োজনীয় করে তুলেছে। এই এলাকায় বসতি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চলমান থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা উল্লেখ করছেন, এই ধরনের সমন্বিত আক্রমণ পূর্বে দেখা যায়নি এবং তা অঞ্চলের উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলছে।
মোট ৫৪ জন ফিলিস্তিনি আঘাতপ্রাপ্তের মধ্যে গুলিবিদ্ধ, গ্যাস শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত এবং কাঁদা ব্যবহারের ফলে ত্বক ও শ্বাসনালীর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত। আহতদের মধ্যে বেশিরভাগই রামাল্লা ও জেনিনের আশেপাশের গ্রামগুলো থেকে এসেছেন, যারা প্রায়ই বসতি সম্প্রসারণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে জরুরি শল্যচিকিৎসা ও শ্বাসযন্ত্রের যত্ন প্রদান করা হয়েছে, তবে সরবরাহের সীমাবদ্ধতা চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলেছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, আঘাতপ্রাপ্তদের মধ্যে গুরত্বপূর্ণ আঘাতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও মানসিক চাপ ও ট্রমা বৃদ্ধি পেয়েছে।
রামাল্লার নিকটবর্তী তুরমুস আয়া এলাকায় বসতি স্থাপনকারীরা প্রায় ৩০০টি জলপাই গাছ কেটে ফেলে এবং কৃষিজমি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। এই গাছগুলো স্থানীয় কৃষকদের জীবিকার প্রধান উৎস, এবং তাদের ধ্বংস ফসলের উৎপাদন ও আয় হ্রাসের সরাসরি কারণ। গাছ কাটা ও ভূমি ধ্বংসের কাজের সময় বসতি সম্প্রসারকদের সঙ্গে ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর সমন্বয় স্পষ্টভাবে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা পূর্বে এ ধরনের পরিবেশগত ধ্বংসকে যুদ্ধাপরাধের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
একই সময়ে ইজরায়েলি সামরিক বাহিনী দেইর গাসানেহ, বেইত রিমা, জেনিনের জাবা, সিরিস ও মেইথালুন গ্রামগুলোতে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে তরুণ সক্রিয় কর্মী ও স্থানীয় নেতা অন্তর্ভুক্ত, যাদের ওপর নিরাপত্তা হুমকি ও গৃহহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের পরিবারগুলোকে জানানো হয়েছে যে তারা সাময়িকভাবে সামরিক শিবিরে রাখা হবে এবং আইনগত প্রক্রিয়া চলবে। এই ধরনের গ্রেপ্তারকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস এই সব আক্রমণকে “নৃশংস” বলে নিন্দা জানিয়ে একটি প্রকাশ্য বিবৃতি জারি করেছে। বিবৃতিতে ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে “জাতিগত নির্মূল নীতি” বাস্তবায়নকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। হামাস আরও উল্লেখ করেছে, সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীদের ইজরায়েলি সামরিক বাহিনীর সুরক্ষা প্রদান করে ফিলিস্তিনিদের ওপর আক্রমণের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। সংস্থা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি বিশেষজ্ঞ ড. অ্যালান রিভার্স উল্লেখ করেন, “ইজরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ও সামরিক হস্তক্ষেপের ধারাবিকতা শান্তি প্রক্রিয়াকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।” তিনি আরও বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত ও নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।” ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিও জোর দিয়ে বলেছেন, “বসতি সম্প্রসারণের সঙ্গে সামরিক জোরের সমন্বয় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এবং তা অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার।” এই মন্তব্যগুলোকে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে এবং কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পশ্চিম তীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে যদি বসতি সম্প্রসারণ ও সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো এখনো এই ঘটনার ওপর জরুরি আলোচনার সূচনা করেছে, যেখানে মানবাধিকার রক্ষা ও শরণার্থী সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের দাবি অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ আলোচনায় বসতি নির্মাণের স্থগিতাদেশ এবং গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি নিশ্চিত করা হবে। শেষ পর্যন্ত, এই ধরণের সংঘাতের পুনরাবৃত্তি রোধে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সমঝোতা ও নিরাপত্তা গ্যারান্টি প্রয়োজন, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সম্ভব হতে পারে।



