মিলান-কর্টিনায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া শীতকালীন অলিম্পিকের প্রস্তুতি চলাকালে দুই তরুণ চীনা-আমেরিকান ক্রীড়াবিদ আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফ্রিস্টাইল স্কি-তে ইলিন গু এবং ফিগার স্কি-তে আলিসা লিউ উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম ও বেড়ে ওঠা, তবে তারা ভিন্ন পতাকার অধীনে প্রতিযোগিতা করছেন। গু চীনের পক্ষে, আর লিউ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মঞ্চে নামবেন।
ইলিন গু ক্যালিফোর্নিয়ায় চীনা মা ও আমেরিকান বাবার সন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা ইয়ান গু, পেকিং বিশ্ববিদ্যালয় ও স্ট্যানফোর্ড থেকে ডিগ্রি অর্জন করে সফল ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট। গু শৈশবের বেশিরভাগ সময় চীনের বেইজিংয়ে গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটিয়েছেন, ফলে দু’টি সংস্কৃতির সঙ্গে তার পরিচয় গড়ে ওঠে। তার চীনা ভক্তরা তাকে “স্নো প্রিন্সেস” উপাধি দিয়ে সম্বোধন করে।
অন্যদিকে আলিসা লিউয়ের পরিবার রাজনৈতিক পটভূমি নিয়ে গঠিত। তার মা চীনের তিয়ানানমেন স্কোয়ারে ১৯৮৯ সালের গণহত্যার পর দেশ ত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন। লিউ যুক্তরাষ্ট্রের পতাকায় প্রতিযোগিতা করার সিদ্ধান্তের পর কিছু আমেরিকান সামাজিক মিডিয়া ব্যবহারকারী গুর প্রতি সমালোচনা প্রকাশ করেন, তাকে চীনের জন্য প্রতিযোগিতা করা এবং বড় অর্থ পাওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেন। একই সময়ে চীনা সামাজিক নেটওয়ার্কে লিউকে তার পারিবারিক পটভূমির কারণে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়।
এই বিতর্কের মূল চালিকাশক্তি হল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বৃহৎ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা। যদিও ক্রীড়া ক্ষেত্রের বেশিরভাগ মানুষ ও ক্রীড়াবিদ এই বিষয়কে দূরবর্তী বলে মনে করেন, তবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সক্রিয় ব্যবহারকারী উভয় ক্রীড়াবিদের প্রতি প্রশ্ন তোলেন। তারা তাদের জাতীয়তা, পারিবারিক ইতিহাস এবং ক্রীড়া ক্যারিয়ারকে একত্রে বিশ্লেষণ করে, কখনও কখনও তাদের ন্যায়পরায়ণতা ও পরিচয় নিয়ে বিতর্ক উত্থাপন করে।
গুর চীনের জন্য অংশগ্রহণের পেছনে তার মা শিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর চীনে ফিরে আসা এবং গুর নিজস্ব চীনা সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ উল্লেখযোগ্য। লিউয়ের ক্ষেত্রে, তার মা চীনের রাজনৈতিক দমন থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের ফলে লিউ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন এবং তার ক্রীড়া প্রশিক্ষণও যুক্তরাষ্ট্রে সম্পন্ন হয়। উভয় ক্রীড়াবিদই তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় এবং অলিম্পিকের জন্য উচ্চ প্রত্যাশা বহন করে।
অনলাইন বিতর্কের বেশিরভাগই একতরফা নয়; কিছু ব্যবহারকারী গুরকে চীনের জন্য গর্বের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে প্রশংসা করেন, আবার অন্যরা লিউকে চীনা অভিবাসী সম্প্রদায়ের সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তবে উল্লেখযোগ্য যে, এই মতবিরোধ মূলত সামাজিক মিডিয়ার সীমিত অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা বৃহত্তর ক্রীড়া সম্প্রদায়ের মনোভাবকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না।
শীতকালীন অলিম্পিকের সময়সূচি অনুযায়ী গু ও লিউ উভয়েই তাদের নিজস্ব ইভেন্টে প্রতিযোগিতা করবেন। গু ফ্রিস্টাইল স্কি-তে চীনের জন্য সোনার সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, আর লিউ ফিগার স্কি-তে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শীর্ষস্থান অর্জনের লক্ষ্যে প্রস্তুত। উভয়ই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করছেন।
এই দুই ক্রীড়াবিদের পারস্পরিক তুলনা এবং তাদের জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন কেবল ক্রীড়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে একটি প্রতিফলন। শীতকালীন অলিম্পিকের মঞ্চে তাদের পারফরম্যান্স কেবল স্বর্ণপদক নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে চলমান নরম শক্তির প্রতিযোগিতার একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। ভবিষ্যতে এই ধরনের বিতর্ক ক্রীড়া ও রাজনীতির সংযোগকে আরও জটিল করে তুলতে পারে, তবে বর্তমান সময়ে গুর ও লিউ উভয়ই তাদের নিজস্ব লক্ষ্য অর্জনের জন্য মনোনিবেশ করেছেন।



