ইল্কার চাটাকের নতুন চলচ্চিত্র ‘ইলিশের চিঠি’ (ইংরেজি শিরোনাম Yellow Letters) বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে প্রথম প্রদর্শনী পেল। গৃহনির্মাণের পরের কাজ হিসেবে, তিনি পূর্বের জার্মান মাধ্যিক বিদ্যালয় নাটক ‘দ্য টিচার্স লাউঞ্জ’‑এর পর এই রূপকথা‑সদৃশ রচনায় অগ্রসর হলেন।
ফিল্মটি আধুনিক তুরস্কের রাজনৈতিক পরিবেশকে পটভূমি করে, যেখানে স্বৈরশাসন, শিল্পের সংগ্রাম এবং পারিবারিক দ্বন্দ্বের থিমগুলো একত্রে বোনা হয়েছে। তবে শুটিং সম্পূর্ণ জার্মানিতে সম্পন্ন হয়েছে, এবং দৃশ্যপটের কোনো স্পষ্ট স্থানীয় চিহ্ন না রেখে তুর্কি বাস্তবতা উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রযোজনার আর্থিক সহায়তা বেশ কয়েকটি জার্মান সাংস্কৃতিক তহবিল থেকে এসেছে, যা চাটাককে তুর্কি শাসনকে সমালোচনা করার স্বাধীনতা দিয়েছে। যদিও চলচ্চিত্রটি তুর্কি বর্তমান শাসনকে সরাসরি নাম না দিয়ে সমালোচনা করে, তবু ত্রিপাক্ষিক দমন নীতি ও সৃজনশীল স্বাধীনতার ওপর আলোকপাত করে।
চাটাকের জন্মবার্লিনে, অভিবাসী পিতামাতার সন্তান হিসেবে, তিনি জার্মানিতে প্রায় পাঁচ শতাংশের কাছাকাছি তুর্কি জনসংখ্যার অংশ। তার এই পটভূমি তাকে নিজের ডায়াস্পোরা অভিজ্ঞতা চলচ্চিত্রে তুলে ধরতে উদ্বুদ্ধ করেছে, যেখানে বিদেশে বসবাসরত তুর্কি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও সৃজনশীল সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়।
চিত্রে প্রধান ভূমিকায় কাজ করেছেন তুর্কি অভিনেত্রী ওগু নামাল, তানসু বিচার, লেইলা স্মিরনা ক্যাবাস এবং ইপেক বিলগিন। তাদের পারফরম্যান্সকে সমালোচকরা চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন, বিশেষ করে জটিল পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বকে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে।
চিত্রনাট্যটি ইল্কার চাটাক, আয়দা মেরিয়েম চাটাক এবং এনিস কোস্টেপেনের যৌথ রচনা, মোট দৈর্ঘ্য দুই ঘণ্টা সাত মিনিট। গল্পের গঠন ও সংলাপগুলো আধুনিক রাজনৈতিক রূপকের কাঠামো অনুসরণ করে, যেখানে প্রতীকী চিঠি ও গোপনীয় বার্তা মাধ্যমে দমনমূলক শাসনের মুখোশ উন্মোচিত হয়।
প্রাথমিক সমালোচনায় চলচ্চিত্রের দৃশ্যমান পরিবেশ ও দমনের বায়ুমণ্ডলকে প্রশংসা করা হয়েছে, তবে অতিরিক্ত বিমূর্ততা ও অবস্থানগত অস্পষ্টতা দর্শকের আবেগগত সংযোগকে দুর্বল করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট না জানিয়ে রূপকথা রূপে উপস্থাপন করা কিছু দর্শকের জন্য তীব্র প্রভাব তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রারম্ভিক দৃশ্যটি প্রতীকী চিত্রের মাধ্যমে রূপকথার স্বর নির্ধারণ করে, যেখানে অন্ধকার ঘর, বন্ধ দরজা এবং গোপন চিঠি দেখা যায়। এই উপাদানগুলো চলচ্চিত্রের মূল থিম—শক্তি, সৃজনশীলতা এবং পারিবারিক বন্ধনের সংঘাত—কে সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করে।
চাটাকের ২০২৩ সালের অস্কার মনোনীত চলচ্চিত্রের তুলনায় ‘ইলিশের চিঠি’ কিছুটা কম তীব্রতা পায়, তবে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বিষয়বস্তুর গভীরতা এখনও প্রশংসনীয়। দুই চলচ্চিত্রের মধ্যে পার্থক্য মূলত বর্ণনায় স্পষ্টতা ও রাজনৈতিক নির্দিষ্টতার মাত্রায় দেখা যায়।
চিত্রের ভৌগোলিক অস্পষ্টতা ও তুর্কি শাসনের সরাসরি উল্লেখ না করা কিছু সমালোচকের মতে, চলচ্চিত্রের সামাজিক-রাজনৈতিক বার্তাকে আরও তীক্ষ্ণ করা সম্ভব হতো। তবু এই পদ্ধতি আন্তর্জাতিক দর্শকদের জন্য একটি বিস্তৃত ব্যাখ্যা প্রদান করে, যা বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সহায়তা করে।
সামগ্রিকভাবে, ‘ইলিশের চিঠি’ তুর্কি ডায়াস্পোরার পরিচয়, শিল্পের স্বাধীনতা এবং স্বৈরশাসনের বিরোধিতা নিয়ে একটি সমসাময়িক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে। চলচ্চিত্রটি জার্মানিতে শুট হওয়া সত্ত্বেও তুর্কি সমাজের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোকে উন্মোচন করে, যা একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রমঞ্চে তুর্কি কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করে।
বার্লিন ফেস্টিভ্যালে এই চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী আন্তর্জাতিক বিতরণ ও চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন দেশে স্ক্রিনিং ও বিতরণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা তুর্কি-জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
দর্শকদের জন্য এই চলচ্চিত্রটি কেবল একটি রাজনৈতিক রূপক নয়, বরং পারিবারিক সম্পর্ক, শিল্পের সংগ্রাম এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সন্ধানে একটি গভীর অনুসন্ধান। তুর্কি ও জার্মান সংস্কৃতির সংযোগস্থলে বসে, ‘ইলিশের চিঠি’ আধুনিক সমাজের জটিলতা ও মানবিক মূল্যবোধের পুনর্মূল্যায়নকে আহ্বান জানায়।



