নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা উপজেলার ফতুল্লা গ্রামাঞ্চলে একটি সেলুনে গ্যাস লিকেজের ফলে বিস্ফোরণ ঘটেছে। ঘটনাটি শুক্রবার বিকাল প্রায় ৫ টার দিকে সোয়া ৫ নম্বর এলাকার কাছাকাছি ঘটেছে। বিস্ফোরণে সেলুনের কর্মী মিন্টু মিয়া (২৫) এবং চার বছর বয়সী এক অজ্ঞাত শিশুর দেহ দগ্ধ হয়েছে। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে জরুরি তদারকি শুরু করেছে।
ফতুল্লা ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, ঘটনাস্থলটি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গ্যাস লাইনের পাশে অবস্থিত। গ্যাস লিকেজের ফলে সেলুনের ঘরে গ্যাস জমা হয়ে স্পার্কের সংস্পর্শে বিস্ফোরণ ঘটেছে। তৎকালীন সময়ে কোনো অগ্নিকাণ্ডের রিপোর্ট না থাকলেও গ্যাসের প্রবাহ অব্যাহত ছিল। অগ্নি নির্বাপণ কাজের সময় ফায়ারফাইটাররা গ্যাসের গন্ধের তীব্রতা পর্যবেক্ষণ করে নিরাপত্তা দূরত্ব বজায় রাখে।
দগ্ধ কর্মী এবং শিশুকে তৎক্ষণাৎ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা দল জানায়, উভয়ের দেহে তীব্র দগ্ধতার চিহ্ন দেখা গেছে এবং তীব্র শ্বাসকষ্টের লক্ষণ রয়েছে। দগ্ধতার পরিমাণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
প্রাথমিক তদন্তে গ্যাস লিকেজের মূল কারণ হিসেবে তিতাস গ্যাসের পুরনো পাইপলাইনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। লিকেজের ফলে গ্যাস ঘরের ভেতরে সঞ্চিত হয়ে স্পার্কের সংস্পর্শে বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা লিকেজের স্থান চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করেছে। তবে লিকেজের সঠিক সময় ও কারণ নির্ধারণের জন্য ফরেনসিক বিশ্লেষণ চালু রয়েছে।
বিস্ফোরণের পর গ্যাস লিকেজ এখনও চলমান ছিল, তাই ফায়ার সার্ভিস গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। স্থানীয় গ্যাস কোম্পানিকে ঘটনাটি জানানো হয়েছে এবং তারা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিকেজ মেরামতের কাজ শুরু করেছে। মেরামত কাজের সময় গ্যাস লিকেজের সুনির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করে সিলিং ও টেস্টিং সম্পন্ন করা হয়েছে। মেরামত কাজের অগ্রগতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের জন্য তত্ত্বাবধানকারী সংস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে।
সেলুনের পাশে অবস্থিত ফার্নিচার দোকানের মালিক মো. মামুন জানান, বিস্ফোরণের সময় হঠাৎ তীব্র শব্দ শোনা যায় এবং অগ্নিকুণ্ডের তাপে তিনি কিছুটা দগ্ধ হয়েছেন। তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে গ্যাসের গন্ধ ও ধোঁয়া লক্ষ্য করেন। তার মতে, সেলুনের কাঠামো ও আশেপাশের দোকানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিতাস গ্যাসের ফতুল্লা অঞ্চলের ব্যবস্থাপক আতিকুর রহমান উল্লেখ করেন, এলাকায় বেশ কিছু পুরনো গ্যাস লাইন রয়েছে এবং বর্তমানে সেগুলোর মেরামত ও আধুনিকায়ন কাজ চলছে। তিনি জানান, এই ধরনের দুর্ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণে অতিরিক্ত সতর্কতা নেওয়া হবে। মেরামত কাজের সময় সঠিক তদারকি ও পরীক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা রোধের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ ঘটনাস্থলে ফরেনসিক টিম পাঠিয়ে বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ ও দায়িত্ব নির্ধারণের কাজ শুরু করেছে। গ্যাস লিকেজের দায়িত্বে থাকা কোম্পানি, সেলুনের মালিক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অবহেলা বা নিরাপত্তা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হতে পারে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে প্রাসঙ্গিক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আদালতে মামলা দায়ের করা হবে। বর্তমানে কোনো সন্দেহভাজন বা অপরাধী গ্রেফতার করা হয়নি।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে গ্যাস লিকেজের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি ও দগ্ধতার জন্য দায়বদ্ধতা নির্ধারণে গ্যাস কোম্পানির লাইসেন্স, রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ড এবং সেলুনের নিরাপত্তা মানদণ্ডের পর্যালোচনা করা হবে। যদি মেরামতে অবহেলা বা নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন প্রমাণিত হয়, তবে কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপর জরিমানা, ক্ষতিপূরণ এবং কারাদণ্ডের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্যাস কোম্পানির রক্ষণাবেক্ষণ রেকর্ডে কিছু ত্রুটি পাওয়া গেছে, যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে। আদালতের রায়ের আগে তদন্ত দল সকল প্রমাণ সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ চালিয়ে যাবে।
এই ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন গ্যাস লিকেজ প্রতিরোধে জরুরি পরিদর্শন ও রক্ষণাবেক্ষণ নির্দেশনা জারি করেছে। গ্যাস লাইন সংক্রান্ত নিয়মাবলী মেনে চলতে না পারা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তৎক্ষণাত বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নাগরিকদের জন্য গ্যাস নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনাও করা হয়েছে। নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়াতে জনগণকে গ্যাসের গন্ধ বা অস্বাভাবিক শব্দের ক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ কর্তৃপক্ষকে জানাতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিস্ফোরণ ঘটনার পরবর্তী সপ্তাহে ফতুল্লা ফায়ার স্টেশন এবং গ্যাস কোম্পানি যৌথভাবে লিকেজের পুনরাবৃত্তি রোধে অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তদুপরি, স্থানীয় হাসপাতালগুলো দগ্ধতার শিকারদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা সেবা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে। এই ধরনের দুর্যোগের মোকাবিলায় সমন্বিত জরুরি সেবা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা পুনরায় জোর দেওয়া হয়েছে।
তদন্ত চলমান থাকায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নতুন তথ্য পাওয়া মাত্রই জনসাধারণকে জানানো হবে। এই ঘটনা গ্যাস নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্বকে পুনরায় তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনের শেষে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সমন্বয়ে পুনরায় নিরাপত্তা মানদণ্ডের পর্যালোচনা করা হবে।



