যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে (MSC) বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ‑রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন যুগে প্রবেশের ইঙ্গিত দেন। তিনি ইউরোপ সফরের পূর্বে এই মন্তব্য করেন, যেখানে তিনি মার্কিন প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসেবে অংশগ্রহণ করবেন। রুবিওর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল পুরনো আন্তর্জাতিক কাঠামোর অপ্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা পুনর্মূল্যায়নের আহ্বান জানানো।
রুবিও উল্লেখ করেন, বর্তমান বিশ্বে দ্রুত পরিবর্তনশীল শর্তাবলী পুরনো নীতিমালা ও সংস্থাগুলোকে অপ্রচলিত করে তুলেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রতিটি দেশের নতুন বাস্তবতায় কী ভূমিকা পালন করবে তা পুনরায় বিবেচনা করা জরুরি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
মিউনিখে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে রুবিও ইউরোপ থেকে মার্কিন সরকার সরে যাওয়ার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বার্থের জন্য ইউরোপীয় অংশীদারিত্ব অপরিহার্য এবং নতুন যুগেও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। তার এই অবস্থান গত বছরের ভ্যান্সের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন, যিনি পূর্বে ইউরোপকে আক্রমণাত্মকভাবে সমালোচনা করে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিলেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস যুক্তরাষ্ট্রকে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের আস্থা পুনর্নির্মাণের আহ্বান জানান। তিনি মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে নিরাপত্তা কাঠামোকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এই আহ্বান রুবিওর নতুন যুগের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইউরোপীয় দেশগুলোতে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড সংযুক্তির হুমকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেন রুবিওর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। এই আলোচনার মূল বিষয় হল ইউরোপীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব এবং ন্যাটো (Nato) কাঠামোর ভবিষ্যৎ।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও ইউরোপের স্বাবলম্বিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। এই অবস্থান রুবিওর মিত্রদের সঙ্গে সংলাপের আহ্বানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যদিও দুজনের দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছু পার্থক্য রয়ে গেছে।
সম্মেলনের আগে ন্যাটোর (Nato) সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে মার্কিন সরকারে আস্থার হ্রাসের ইঙ্গিত দেন। তিনি উল্লেখ করেন, ট্রান্সআটল্যান্টিক সম্পর্কের পুনর্গঠন না হলে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা কাঠামোর স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রুবিও এই উদ্বেগের প্রতি সাড়া দিয়ে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার ইচ্ছা পুনরায় প্রকাশ করেন।
রুবিওর বক্তব্যে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “পুরোনো বিশ্ব চলে গেছে, আর আমরা এখন নতুন ভূ‑রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাস করছি।” তিনি যুক্তি দেন, এই নতুন বাস্তবতায় প্রতিটি দেশের কৌশলগত অবস্থান ও দায়িত্ব পুনরায় নির্ধারণ করা অপরিহার্য। তার এই মন্তব্য মিউনিখে উপস্থিত বহু নেতার দৃষ্টিতে নতুন নীতি গঠনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে এবং রুবিওর উপস্থিতি এই বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আলোচনার সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্মেলনে ন্যাটো (Nato) সদস্য দেশগুলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণে মনোনিবেশ করবে। রুবিওর নেতৃত্বে মার্কিন দল এই আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্মেলনের মূল এজেন্ডায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, চীনের সামরিক আধিপত্য, সাইবার নিরাপত্তা এবং টেররবাদের মোকাবিলা অন্তর্ভুক্ত। রুবিও এই বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে, মিত্রদের সঙ্গে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, নতুন ভূ‑রাজনৈতিক যুগে কেবল সামরিক শক্তি নয়, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মিউনিখে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন ন্যাটো (Nato) ও ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রুবিওর নতুন যুগের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইউরোপীয় নেতাদের উদ্বেগের মেলবন্ধন কিভাবে গঠিত হবে তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। শেষ পর্যন্ত, এই আলোচনার ফলাফল বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠন ও মিত্র দেশগুলোর কৌশলগত সমন্বয়ের ভিত্তি স্থাপন করবে।



