করাচির একটি ইনডোর স্পোর্টস ক্লাবে রাতের ন্যূনতম আলোয় তরুণ-তরুণীরা নাচের ছন্দে মেতে উঠেছে, হাতে কফি বা আইসড টি ধরে। অ্যালকোহল বা মাদকদ্রব্যের কোনো চিহ্ন না থাকায় এই সমাবেশকে শহরের নতুন সামাজিক মডেল হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
সঙ্গীতের তালের সঙ্গে নাচ চলতে থাকে, তবে রাত দশটায় সাউন্ড সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এই সময়সূচি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নীতির অংশ, যা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়তা করে।
পাকিস্তানের জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে, ফলে তারা ‘সোবার সোশ্যালাইজিং’ নামে পরিচিত নেশামুক্ত সমাবেশকে পছন্দ করছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অ্যালকোহল নিষিদ্ধ, আর দেশের অধিকাংশ জনগণ মুসলিম হওয়ায় মদ-মাদকবিহীন আড্ডা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
এর আগে তরুণরা গোপন পার্টি বা আন্ডারগ্রাউন্ড সমাবেশে অংশ নিত, যেখানে মদ ও মাদক প্রায়ই উপস্থিত থাকত এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরে পড়ার ঝুঁকি ছিল। এখন সরকারী অনুমোদন নিয়ে স্পোর্টস ক্লাব, কফি শপ এবং আর্ট গ্যালারিতে একই ধরনের, তবে সম্পূর্ণ পরিষ্কার পরিবেশে অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
স্পোর্টস ক্লাবের আয়োজিত সমাবেশে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সীমিত রাখা হয়, এবং নাচের বিরতিতে প্যাডেল নামে একটি র্যাকেট গেমের সেশনও থাকে, যা টেনিস ও স্কোয়াশের মিশ্রণ। এই ধরনের কার্যক্রম তরুণদের শারীরিক সক্রিয়তা ও সামাজিক মেলামেশা একসাথে প্রদান করে।
একজন সফটওয়্যার উদ্যোক্তা উল্লেখ করেন, করাচিতে জনসাধারণের জন্য সামাজিক প্রকাশের স্থান খুব কম, তাই এই ধরনের ইভেন্টগুলোকে লুকিয়ে না থেকে জনসমক্ষে মেলামেশার সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। তিনি অতীতের আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টিগুলোকে নিরাপদ নয় বলে বর্ণনা করেন, যেখানে অনিশ্চয়তা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি সর্বদা উপস্থিত থাকত।
ইভেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘১২এক্সপেরিয়েন্স’ নামের আয়োজক সংস্থা ড্রোন এবং দেয়ালে স্থাপিত ক্যামেরা ব্যবহার করে পুরো সমাবেশের নজরদারি করে। এই প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা মাদকের ব্যবহার বা কোনো অনুপযুক্ত আচরণ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা উসমান আহমেদ জানান, তারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চায় যেখানে মানুষ মদ, মাদক বা বিশৃঙ্খলা ছাড়া নিরাপদে সময় কাটাতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তরুণদের মধ্যে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তার চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
করাচির বিভিন্ন অংশে, স্পোর্টস ক্লাবের পাশাপাশি কফি শপ ও আর্ট গ্যালারিতে একই রকম নেশামুক্ত পার্টি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই প্রবণতা শহরের সামাজিক দৃশ্যপটে নতুন রঙ যোগ করেছে এবং তরুণদের জন্য বিকল্প বিনোদনের সুযোগ বাড়িয়েছে।
ইউরোমনিটরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পাকিস্তানে সফট ড্রিংক ও গরম কফির বাজারে ২৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি দেখা গেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বাজারকে ছাড়িয়ে গেছে। এই বৃদ্ধির পেছনে তরুণদের স্বাস্থ্যকর পানীয়ের প্রতি বাড়তি আগ্রহ একটি মূল কারণ।
সমাজবিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেন, নতুন প্রজন্মের এই প্রবণতা সামাজিক মেলামেশার পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন নির্দেশ করে। তারা যুক্তি দেন, নেশামুক্ত পরিবেশে মেলামেশা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাত্রার দিকে ধাবিত করে।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে, করাচি ও সমগ্র পাকিস্তানে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর সামাজিক স্থান গড়ে তোলার সম্ভাবনা বাড়বে। তরুণদের জন্য বিকল্প বিনোদনের বিকাশে সরকার ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, যাতে নেশা-মুক্ত সমাবেশকে আরও বিস্তৃত করা যায়।



