ঢাকা শহরের প্রধান বাজারগুলোতে বিক্রেতা ও ক্রেতার সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে, তবু মাছ ও মাংসের বিক্রয়মূল্য পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। এই প্রবণতা গত কয়েক সপ্তাহে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যেখানে বিক্রেতা কমে যাওয়া সত্ত্বেও সরবরাহের ঘাটতি ও লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধির ফলে দাম উঁচুতে আটকে আছে।
বিক্রেতা কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোতে স্থানীয় উৎপাদন হ্রাস, মৌসুমী পরিবর্তন এবং পরিবহন খরচের বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে শীতকালে মাছের প্রজনন মৌসুম শেষ হওয়ায় তাজা মাছের সরবরাহ কমে যায়, ফলে বিক্রেতারা কমে যায় এবং বাকি বিক্রেতারা উচ্চ মূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। মাংসের ক্ষেত্রে, গবাদি পশুর খাওয়ানোর খরচ এবং শীতল সংরক্ষণ সুবিধার অভাব দামকে ত্বরান্বিত করেছে।
বাজারে ক্রেতা কমে যাওয়ার পেছনে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার হ্রাস এবং দামের উদ্বেগ কাজ করছে। সাম্প্রতিক মাসে মুদ্রাস্ফীতি হার বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পরিবারগুলোর দৈনন্দিন ব্যয়কে প্রভাবিত করছে। ফলে, অনেক গ্রাহক বাজারে যাওয়ার পরিবর্তে সুপারমার্কেট বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সস্তা বিকল্প খুঁজে বেড়াচ্ছেন, যা ঐতিহ্যবাহী বাজারের গ্রাহক সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছে।
বাজারের এই দ্বিমুখী সংকটের ফলে বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েরই লাভের মার্জিন সংকুচিত হয়েছে। বিক্রেতারা উচ্চ মূল্যে বিক্রি করতে পারলেও বিক্রয় পরিমাণ কমে যাওয়ায় মোট আয় হ্রাস পায়। অন্যদিকে, ক্রেতারা বাড়তি দামের মুখে প্রয়োজনীয় প্রোটিনের পরিমাণ কমিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা পুষ্টিগত দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশ কৃষি ও কৃষিকাজ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মাছের উৎপাদন গত বছর তুলনায় ৫% কমেছে, আর গরুর মাংসের উৎপাদনও ৩% হ্রাস পেয়েছে। এই পরিসংখ্যান বাজারে সরবরাহের ঘাটতি বাড়িয়ে দেয় এবং দামকে উঁচুতে রাখে। মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে মাছের উৎপাদন বাড়াতে নতুন পুকুর নির্মাণ ও আধুনিক চাষ পদ্ধতি প্রয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, তবে তা বাস্তবায়নে সময় লাগবে।
বাজারে দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু বিক্রেতা বিকল্প পণ্য বিক্রি শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, তেলাপিয়া ও পাঙ্গাসের মতো সাশ্রয়ী মূল্যের মাছের বিক্রয় বাড়ছে, এবং মুরগির বদলে ডিম ও ডাল জাতীয় প্রোটিনের চাহিদা বেড়েছে। এই পরিবর্তন ভোক্তাদের খরচ কমাতে সহায়তা করছে, তবে সামগ্রিকভাবে প্রোটিনের গড় দাম এখনও উচ্চই রয়েছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, যদি সরবরাহের ঘাটতি এবং লজিস্টিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে দাম আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে শীতকালে রোডের অবস্থা খারাপ হলে পরিবহন খরচ বাড়বে, যা সরাসরি বাজারের মূল্যে প্রভাব ফেলবে। তাই, সরকারকে লজিস্টিক অবকাঠামো উন্নত করা এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা জরুরি।
ভবিষ্যৎ প্রবণতা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত টেকঅ্যাওয়ে: ১) বিক্রেতা ও ক্রেতার সংখ্যা স্বল্পমেয়াদে কমে থাকবে, তবে সরবরাহের ঘাটতি কমলে দাম ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে পারে; ২) বিকল্প প্রোটিন পণ্যের চাহিদা বাড়বে, যা বাজারের গঠন পরিবর্তন করবে; ৩) সরকারী হস্তক্ষেপ এবং বীজ ও চারা সরবরাহ বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে দাম নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে।
এই পরিস্থিতি ভোক্তা, বিক্রেতা এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কতা স্বরূপ, যাতে সময়মতো পদক্ষেপ নিয়ে বাজারের ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।



