ফরাসি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ইসাবেল হুপের্ট, যাঁর ক্যারিয়ার পাঁচ দশক অতিক্রম করে এবং একশের বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন, বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে নতুন কাজের মাধ্যমে আবারো আলোতে ফিরে এসেছেন। হুপের্টের সর্বশেষ চলচ্চিত্রের শিরোনাম ‘দ্য ব্লাড কাউন্টেস’, যা অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার নীচের খালগুলোতে শুরু হয়, এতে তিনি হাঙ্গেরির ১৭শ শতাব্দীর রক্তপিপাসু কাউন্টেস এলিজাবেথ বাথোরির ভূমিকায় রূপান্তরিত হয়েছেন। এই চরিত্রটি ঐতিহাসিকভাবে একাধিক কল্পনাপ্রবণ রক্তপিপাসু কিংবদন্তির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে এবং পূর্বে বিভিন্ন শিল্পকর্মে পুনরায় উপস্থাপিত হয়েছে।
‘দ্য ব্লাড কাউন্টেস’ পরিচালনা করেছেন উলরিকি ওটিঙ্গার, যিনি ৮০ বছরের বেশি বয়সী একটি অগ্রগামী চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং ‘জোয়ান অফ আর্ক অফ মঙ্গোলিয়া’, ‘টিকিট অফ নো রিটার্ন’ ইত্যাদি কাজের জন্য পরিচিত। ওটিঙ্গারের এই প্রকল্পটি হুপের্টের জন্য একটি অস্বাভাবিক চ্যালেঞ্জ, যেখানে তিনি ঐতিহ্যবাহী আর্টহাউস শৈলীর বাইরে গিয়ে ক্যাম্প এবং অতিরঞ্জিত পারফরম্যান্সের মিশ্রণ উপস্থাপন করেন। চলচ্চিত্রের প্রথম দৃশ্যে হুপের্ট একটি লাল রঙের চাদরে মোড়ানো নৌকায় ভাসমান অবস্থায় দেখা যায়, যা ১৯৮০-এর দশকের রক ভিডিওর স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে।
হুপের্টের অভিনয়কে বিশ্লেষকরা ‘অত্যন্ত অতিরঞ্জিত’ এবং ‘উদ্দীপনাময়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে তিনি চরিত্রের রক্তপিপাসু প্রকৃতিকে পুরোপুরি গ্রহণ করেছেন। তিনি নিজে উল্লেখ করেছেন যে, তার ক্যারিয়ারে এ ধরনের অস্বাভাবিক এবং অনন্য ভূমিকায় অভিনয় করা খুবই বিরল। এই মন্তব্যটি চলচ্চিত্রের বিশ্বপ্রদর্শনীতে উপস্থিত দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হয়েছে।
‘দ্য ব্লাড কাউন্টেস’ একটি অ্যান্টি-আর্থহাউস ট্র্যাশ সিনেমা হিসেবে পরিচিত, যেখানে রক্ত, ভয় এবং গথিক ভিজ্যুয়াল উপাদানগুলোকে আধুনিক ক্যাম্প শৈলীর সঙ্গে মিশ্রিত করা হয়েছে। চলচ্চিত্রের কাহিনী বাথোরি কাউন্টেসের ঐতিহাসিক কাহিনীর উপর ভিত্তি করে, যাকে প্রায়শই ‘রক্তের রানী’ বলা হয় এবং যিনি কিশোরী কন্যাদের রক্ত পান করার জন্য কুখ্যাত ছিলেন। যদিও তার প্রকৃত কর্মকাণ্ডের সঠিকতা নিয়ে ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে, তবে এই কিংবদন্তি বহু শিল্পকর্মে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
উলরিকি ওটিঙ্গার এই প্রকল্পে ক্যাম্পের অতিরিক্ততা এবং গথিক ভিজ্যুয়ালকে একত্রিত করে একটি স্বতন্ত্র শৈলী তৈরি করেছেন, যা হুপের্টের অভিনয়কে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। চলচ্চিত্রের দৃশ্যাবলি ভিয়েনার নীচের খালগুলোকে পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করে, যেখানে গথিক স্থাপত্যের ছায়া এবং আধুনিক সাউন্ডট্র্যাকের মিশ্রণ দেখা যায়। এই পরিবেশ হুপের্টের চরিত্রকে অতিপ্রাকৃত এবং ভয়ঙ্কর রূপে উপস্থাপন করতে সহায়তা করে।
বার্লিন ফেস্টিভ্যালে ‘দ্য ব্লাড কাউন্টেস’ বিশ্বপ্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সমালোচক এবং দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। হুপের্টের দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ার এবং তার বহুমুখী চরিত্রের মধ্যে এই নতুন রূপটি একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার পূর্ববর্তী কাজগুলোতে তিনি দমিত সঙ্গীতশিক্ষিকা, নিপীড়িত নারী এবং কঠোর ধর্মীয় মাতা-সুপ্রিয়ার মতো বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তবে এই রক্তপিপাসু কাউন্টেসের ভূমিকায় তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে প্রবেশ করেছেন।
‘দ্য ব্লাড কাউন্টেস’ চলচ্চিত্রটি হুপের্টের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত করেছে, যেখানে তিনি ঐতিহ্যবাহী ফরাসি সিনেমার সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক আর্টহাউস এবং ক্যাম্পের মিশ্রণে নিজেকে প্রকাশ করছেন। এই কাজটি হুপের্টের শিল্পী হিসেবে অবিচ্ছিন্ন অনুসন্ধান এবং রূপান্তরের উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। চলচ্চিত্রের প্রকাশনা এবং হুপের্টের মন্তব্যের মাধ্যমে দেখা যায়, তিনি এখনও নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণে উন্মুক্ত এবং তার অভিনয়কে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করতে ইচ্ছুক।
বার্লিন ফেস্টিভ্যালের পর ‘দ্য ব্লাড কাউন্টেস’ আন্তর্জাতিক বাজারে মুক্তি পাবে, যা হুপের্টের ভক্ত এবং গথিক হরর প্রেমিক উভয়েরই আগ্রহ জাগিয়ে তুলবে। চলচ্চিত্রের অনন্য শৈলী এবং হুপের্টের অপ্রত্যাশিত পারফরম্যান্সের সমন্বয় ভবিষ্যতে আর্টহাউস এবং ক্যাম্পের সংমিশ্রণে নতুন ধারার সূচনা করতে পারে। এই রকম সৃজনশীল প্রকল্পগুলো চলচ্চিত্র শিল্পে বৈচিত্র্য এবং সীমানা প্রসারিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সারসংক্ষেপে, ইসাবেল হুপের্টের ‘দ্য ব্লাড কাউন্টেস’ বার্লিনে বিশ্বপ্রদর্শনীতে আত্মপ্রকাশ করে তার ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। উলরিকি ওটিঙ্গারের দৃষ্টিকোণ এবং হুপের্টের সাহসী অভিনয় একত্রে একটি স্মরণীয় চলচ্চিত্র অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে, যা দর্শকদের রক্ত, গথিক এবং ক্যাম্পের মিশ্রণে মুগ্ধ করবে।



