অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী চলচ্চিত্র নির্মাতা ওয়ারউইক থর্টন তার নতুন ছবির ‘ওলফ্রাম’কে ১৭ ফেব্রুয়ারি বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে উপস্থাপন করবেন। ছবিটি ১৯৩০‑এর দশকে টাঙ্গস্টেন (ওলফ্রাম) খনিতে আদিবাসী শিশুমহিলাদের বাধ্যতামূলক শ্রমের বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
থর্টন পূর্বে ‘সুইট কান্ট্রি’ (২০১৭) দিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি অর্জন করেন। এই চলচ্চিত্রটি তার জন্মস্থান অ্যালিস স্প্রিংসকে পটভূমি করে, এবং তার পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে ডেভিড ট্র্যান্টারের পারিবারিক কাহিনীর সংযোগে গড়ে উঠেছিল।
ডেভিড ট্র্যান্টার, যিনি ‘সুইট কান্ট্রি’ এবং ‘ওলফ্রাম’ দুটিই সহ-লিখেছেন, তার পূর্বপুরুষের গল্পই দুই ছবির মূল ভিত্তি। ‘সুইট কান্ট্রি’ তে ট্র্যান্টারের দাদা-দাদীর সময়ের আদিবাসী পুরুষদেরকে সাদা রাঞ্চারদের জন্য বিনামূল্যে শ্রম সরবরাহের উদ্দেশ্যে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।
‘ওলফ্রাম’ একই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাগুলো তুলে ধরে। ১৯৩০‑এর দশকে টাঙ্গস্টেন খনিতে কাজ করা তরুণী মেয়েরা সংকীর্ণ গুহা ও শ্যাফটে কাজের জন্য বিশেষভাবে ব্যবহার করা হতো, কারণ তাদের শারীরিক গঠন ছোট হওয়ায় তারা সহজে গুহার ভেতরে চলাচল করতে পারত।
টাঙ্গস্টেন, যা স্টিলকে কঠিন করতে ব্যবহৃত হয়, সেই সময়ের বৈশ্বিক সামরিক প্রস্তুতির ফলে অত্যন্ত মূল্যবান পণ্য হয়ে ওঠে। এই চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসী শ্রমিকদের ওপর চাপ বাড়ে, এবং বিশেষ করে ছোট মেয়েদেরকে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
চিত্রের কেন্দ্রীয় কাহিনী দুই ভাইবোনের পালিয়ে যাওয়া নিয়ে গড়ে উঠেছে। তারা সাদা মালিকের কাছ থেকে পালিয়ে কেন্দ্রীয় অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমি, অর্থাৎ ‘সুইট কান্ট্রি’ নামে পরিচিত এলাকা অতিক্রম করে নিরাপত্তা ও বাড়ি ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।
থর্টন নিজে উল্লেখ করেছেন যে তার পূর্বপুরুষ এক সময় চামচ দিয়ে টিন খনন করতেন, যা ঐ সময়ের আদিবাসী শ্রমিকদের কঠিন জীবনের প্রতীক। এই ব্যক্তিগত স্মৃতি ছবির বর্ণনায় গভীরতা যোগ করেছে।
‘সুইট কান্ট্রি’ ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ২০১৭ সালে স্পেশাল জুরি পুরস্কার জিতেছিল এবং বিশ্বব্যাপী দুই মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে একটি সফল স্বাধীন চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত হয়।
থর্টনের সর্বশেষ কাজ ‘দ্য নিউ বয়’, যেখানে ক্যাট ব্ল্যানশেট প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন, ২০২৩ সালে ক্যান্সের ‘আন সের্টেন রেগার’ বিভাগে প্রিমিয়ার হয়। এই চলচ্চিত্রটি আদিবাসী শিশুরা কীভাবে আধুনিক সমাজে নিজেদের পরিচয় গড়ে তোলে তা অনুসন্ধান করেছে।
বার্লিনে ‘ওলফ্রাম’ এর প্রিমিয়ার থর্টনের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যেখানে তিনি আবারও উপনিবেশিক সীমান্তের গৌরব ও কষ্টের গল্পকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করছেন। ছবিটি আদিবাসী নারীর শ্রমিক হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাসকে পুনরায় আলোচনার সুযোগ দেবে।
‘ওলফ্রাম’ কেবল একটি ঐতিহাসিক নাটক নয়; এটি আধুনিক দর্শকদেরকে অস্ট্রেলিয়ার উপনিবেশিক অতীতের অন্ধকার দিকগুলোতে দৃষ্টিপাত করতে আহ্বান জানায়। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে থর্টন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সংগ্রাম, বেঁচে থাকার ইচ্ছা এবং আত্মপরিচয়ের পুনর্গঠনকে শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করছেন।
এই নতুন কাজটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী দর্শক ও সমালোচকরা আদিবাসী নারীর ইতিহাসের এই অজানা অধ্যায়কে কীভাবে গ্রহণ করবেন তা নিয়ে আগ্রহী। থর্টনের চলচ্চিত্রিক যাত্রা এখনো শেষ হয়নি; ‘ওলফ্রাম’ তার সৃজনশীল দায়িত্বের নতুন এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।



