বাংলাদেশের ১৩তম সংসদীয় নির্বাচনের ভোটের দিন ফেসবুক ও টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক মিথ্যা তথ্যের প্রচার লক্ষ্য করা গেছে। এই তথ্যভ্রান্তি ভোটের পূর্বসন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে ভোটের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল, যা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক সৃষ্টির পাশাপাশি প্রচলিত মিডিয়ার প্রতি আস্থা ক্ষয় করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছিল।
মিথ্যা তথ্যের ঢেউ নির্বাচনের আগের সন্ধ্যা, ১১ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টা থেকে শুরু হয়ে পরের দিন বিকেল ৪:৩০ পর্যন্ত চলেছে। এই সময়কালে ফেসবুক ও টেলিগ্রাম ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন রূপে ভুয়া কন্টেন্ট শেয়ার করে ভোটের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার চেষ্টা করেছে। তথ্যের উত্সের স্বচ্ছতা না থাকায় ভোটারদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রচারের পদ্ধতিতে পুরোনো বছরগুলোর ‘জম্বি কন্টেন্ট’ পুনরায় প্রকাশ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি ডিপফেক ভিডিও এবং ভুয়া সংবাদ ফটোকার্ড অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব কন্টেন্টে প্রার্থীর প্রত্যাহার, নির্বাচনের বাতিলের মতো গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ায়। বিশেষ করে ডিপফেক ভিডিওগুলো বাস্তবের কাছাকাছি দেখায়, ফলে সেগুলি সহজে চেনা যায় না।
দ্য ডেইলি স্টার ১০০টি মিথ্যা তথ্যের উদাহরণ রেকর্ড করেছে, যা ১১ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টা থেকে ভোটের দিন বিকেল ৪:৩০ পর্যন্ত সামাজিক মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। রেকর্ডকৃত কন্টেন্টের মধ্যে ৩৭টি ফটোকার্ড, ৩০টি ভিডিও, ৮টি ছবি এবং ৩টি ডিপফেক অন্তর্ভুক্ত। এই তথ্যগুলোকে কোনো রাজনৈতিক সংযুক্তি বিবেচনা না করে নথিভুক্ত করা হয়েছে, ফলে মিথ্যা তথ্যের প্রকৃত পরিসর স্পষ্ট হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিথ্যা তথ্যের ৬৫ শতাংশ জামায়াত-এ-ইসলামি সমর্থক গোষ্ঠীর দ্বারা ছড়ানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থক গোষ্ঠী ২১.২১ শতাংশ, বিএনপি সমর্থক ৭ শতাংশ এবং ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি সমর্থক ৩ শতাংশ তথ্য ছড়িয়েছে। এই সংখ্যা দেখায় যে জামায়াত-এ-ইসলামি সমর্থকরা ডিজিটাল মিথ্যা তথ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সক্রিয়।
ভোটের দিন রাত ১২:২০ টায় ‘InfoBangla’ নামের একটি ফেসবুক পেজে নির্বাচনের বাতিলের দাবি করা হয়। এই ধরনের গুজব ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
তথ্য যাচাই সংস্থা ডিসমিসল্যাব এবং ফ্যাক্টওয়াচ এই মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে। ডিসমিসল্যাব প্রায় এক ডজনের বেশি ভুয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করে তা প্রত্যাখ্যান করেছে, যার মধ্যে প্রার্থীর প্রত্যাহারের গুজবও অন্তর্ভুক্ত। ফ্যাক্টওয়াচ সামাজিক মিডিয়ায় ছড়িয়ে থাকা ফটোকার্ডগুলোকে ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এই ধরনের ডিজিটাল মিথ্যা তথ্যের বিস্তার ভোটারদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ন করে। নির্বাচনের পরবর্তী পর্যায়ে তথ্য যাচাই সংস্থার ভূমিকা বাড়ানো এবং সামাজিক মিডিয়ায় মিথ্যা তথ্যের দ্রুত সনাক্তকরণ ও প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। ভোটারদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক তথ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা ভবিষ্যতে এমন ধরনের মিথ্যা প্রচারকে সীমিত করতে সহায়ক হবে।



