মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের নির্বাচনী কেন্দ্রগুলোতে বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, উর্দুভাষী ক্যাম্পের হাজারো বাসিন্দা ভোট দিতে উপস্থিত হন। তারা ভোটাধিকারের ব্যবহার পাশাপাশি স্থায়ী পুনর্বাসন, মাদকমুক্তি এবং সামাজিক মর্যাদার পূর্ণ স্বীকৃতির দাবি তুলে ধরেছেন।
১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে বসতি নেওয়া উর্দুভাষী সম্প্রদায়ের অধিকাংশ সদস্য ৩৭ বছর পর্যন্ত কোনো সরকারি স্বীকৃতি পায়নি। ২০০৮ সালে উচ্চ আদালতের রায়ে তাদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হলেও, সামাজিক স্বীকৃতি ও বাসস্থানের সমস্যায় সমাধান এখনো দেখা যায়নি।
মিরপুরের বাংলা কলেজ ও অন্যান্য ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটদানকারী উর্দুভাষী ভোটারদের মুখে জীবনের কঠিন বাস্তবতা ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রতি অবিশ্বাসের কথা শোনা যায়। ভোটের দিনই ক্যাম্পের বাসিন্দারা একত্রিত হয়ে তাদের মৌলিক চাহিদা পুনরায় তুলে ধরেন।
তালাব ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ সেলিম জানান, আইডি পেয়ে বিদেশেও গেছেন, তবু এখনও কিছু মানুষ তাদেরকে “আটকা পড়া পাকিস্তানি” বলে সম্বোধন করে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমরা জন্মের পর থেকেই বাংলাদেশ দেখছি, তাই পাকিস্তানি বলা যুক্তিযুক্ত নয়।” তিনি আরও যোগ করেন, ভোট আমাদের অধিকার এবং যেকোনো দল আসুক না কেন, যুব প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বাসস্থান ও উন্নত পরিবেশের প্রয়োজন।
মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী একই সুরে বলেন, ২০০৮ সাল থেকে ভোট দিচ্ছেন এবং সরকার নাগরিকত্ব প্রদান করেছে, তবে রাজনৈতিক দলগুলো যে পুনর্বাসন ও বাড়িঘর গ্যারান্টি দিয়েছে তা বাস্তবে কোনো ফল দেয়নি।
ক্যাম্পের বাসস্থানের অবস্থা তীব্র সংকটের মুখে। মিল্লাত ক্যাম্পের মোহাম্মদ আবিদ জানান, ১০ ফুট বাই ১০ ফুট ঘরে আট থেকে দশজন মানুষ একসাথে বসবাস করে, যেখানে পানির ঘাটতি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহের সমস্যা রয়েছে।
সোহেল আহমেদ উল্লেখ করেন, চারজনের পরিবার এক রুমে থাকে, প্রধান সমস্যাগুলো টয়লেট ও বাথরুমের অভাব। অন্য এক বাসিন্দা রোকসানা বলেন, এক রুমে ঘুমাতে গিয়ে বিছানার ওপরও শোয়া কঠিন হয়ে পড়ে, এবং ঘরের চারপাশে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় জীবনযাপন কষ্টকর। তিনি সরকারকে অনুরোধ করেন, অব্যবহৃত সরকারি জমি পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ করলে সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে।
তালাব ক্যাম্পের সেলিম আরও জানান, বিয়ের পর আলাদা ঘর দরকার হলেও জায়গার অভাবে দুই-তিন তলা বাড়ি গড়তে ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। ওয়াপদা বিল্ডিং ক্যাম্পের নূরজাহান ড্রেনেজের অবনতি ও গ্যাস সরবরাহের অনিয়মিততা নিয়ে অভিযোগ করেন, যা বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে।
উর্দুভাষী ভোটারদের এই দাবি নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আরও দৃশ্যমান হয়েছে। তারা জোর দিয়ে বলছে, ভোটাধিকার পাওয়া মানে সামাজিক স্বীকৃতি নয়; বাস্তবিকভাবে বাসস্থানের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মাদকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত না হলে নাগরিকত্বের মূল্য কমে যায়।
রাজনৈতিক দলগুলো এখন এই দাবিগুলোকে কীভাবে মোকাবেলা করবে তা দেশের সামগ্রিক শরণার্থী নীতি ও মানবিক দায়িত্বের ওপর প্রভাব ফেলবে। উর্দুভাষী সম্প্রদায়ের ভোটদানের পরিমাণ ও তাদের ভোটের প্রভাব বিবেচনা করে, সরকার ও পার্টিগুলোকে পুনর্বাসন পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করতে এবং ক্যাম্পের মৌলিক সেবা উন্নত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
ভবিষ্যতে উর্দুভাষী ক্যাম্পের বাসিন্দারা আশা করছেন, সরকার তাদের জন্য নির্দিষ্ট জমি বরাদ্দ করে স্থায়ী বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা প্রকাশ করবে, পাশাপাশি মাদকমুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ নীতি গঠন করবে। এই প্রক্রিয়া না হলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে এবং নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
উর্দুভাষী ভোটারদের এই সমাবেশ ও দাবিগুলো দেশের মানবিক দায়িত্বের পুনর্বিবেচনা এবং শরণার্থী নীতির পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। ভোটের পরবর্তী সময়ে সরকার কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবে, তা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে থাকবে।



