শিকাগোতে ভিত্তিক ওয়াটারমেলন পিকচার্স প্রায় দুই বছর আগে বাদি আলি ও হামজা আলি ভাইদ্বয় প্রতিষ্ঠা করেন। কোম্পানির মূল লক্ষ্য হল প্যালেস্টাইনসহ অবহেলিত সম্প্রদায়ের গল্পকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তারা এমন চলচ্চিত্র তৈরি ও বিতরণ করতে চায় যা প্রধান স্টুডিওগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বলে এড়িয়ে যায়।
কোম্পানির নামকরণ করা হয়েছে সেই ফলের ওপর ভিত্তি করে, যার রঙ প্যালেস্টাইনের পতাকার রঙের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং তা প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়। প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ওয়াটারমেলন পিকচার্স “ফিল্মের শক্তি দিয়ে অবহেলিত কণ্ঠকে জোরদার করা”কে মিশন হিসেবে গ্রহণ করে। এই মিশনকে বাস্তবায়নের জন্য তারা স্বতন্ত্রভাবে প্রযোজনা ও বিতরণ উভয় ক্ষেত্রেই কাজ করে।
বাজারে রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়ের চলচ্চিত্রগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে গণ্য করা হয়, বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে সেগুলোকে সীমাবদ্ধ করা হতো। ওয়াটারমেলন পিকচার্স এমন বাধা অতিক্রম করে সাহসী বিতরণকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারা দাবি করে যে, অবহেলিত কণ্ঠকে বিশ্বে শোনাতে তারা কোনো ঝুঁকি থেকে পিছু হটে না।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে কোম্পানি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টারি ও ফিচার মুক্তি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে “দ্য এনক্যাম্পমেন্টস”, যা কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-প্যালেস্টাইন ছাত্র সক্রিয়কর্মী মাহমুদ খালিলের গল্প তুলে ধরে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হল “ফ্রম গ্রাউন্ড জিরো”, যেখানে ২২ জন প্যালেস্টাইনীয় পরিচালক গাজা অঞ্চলের জীবন ও মৃত্যুর চিত্রায়ণ করেছেন। উভয় প্রকল্পই রাজনৈতিক তীব্রতা এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণাত্মকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
ওয়াটারমেলন পিকচার্সের সহ-প্রযোজনা তালিকায় রয়েছে “প্যালেস্টাইন ৩৬”, একটি ঐতিহাসিক নাটক যা প্যালেস্টাইনের অতীতকে পুনর্নির্মাণ করে। “দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব” চলচ্চিত্রটি গাজায় ছয় বছর বয়সী মেয়ের এবং তার পরিবারের হত্যাকাণ্ডের উপর ভিত্তি করে তৈরি, যা আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এছাড়া “অল দ্যাটস লেফ্ট অব ইউ” নামের প্যালেস্টাইনীয় পারিবারিক মহাকাব্যিক চলচ্চিত্রও তাদের পোর্টফোলিওতে অন্তর্ভুক্ত।
উল্লেখযোগ্যভাবে, এই তিনটি চলচ্চিত্রই সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য অস্কার শর্টলিস্টে স্থান পেয়েছে, যার মধ্যে “দ্য ভয়েস অব হিন্দ রাজাব” শেষ পর্যন্ত নামাঙ্কনও পেয়েছে। এই স্বীকৃতি ওয়াটারমেলন পিকচার্সের কৌতুকপূর্ণ ও সাহসী বিতরণ নীতির প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অস্কার তালিকায় স্থান পাওয়া চলচ্চিত্রগুলো কোম্পানির আন্তর্জাতিক সুনামকে আরও দৃঢ় করেছে।
বাদি ও হামজা আলি ভাইদ্বয়ের চলচ্চিত্র ব্যবসায়িক পটভূমি শৈশব থেকেই গড়ে উঠেছে; তারা উভয়ই পরিবারিক পরিবেশে বড় হয়ে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দিক শিখেছেন। এই অভিজ্ঞতা তাদেরকে স্বাধীনভাবে কাজ করার আত্মবিশ্বাস এবং শিল্পের জটিলতা বোঝার সুযোগ দিয়েছে। তাই তারা ওয়াটারমেলন পিকচার্সকে শুধু একটি বিতরণকারী নয়, বরং একটি সৃজনশীল হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
ওয়াটারমেলন পিকচার্স বর্তমানে MPI মিডিয়া গ্রুপের একটি ইউনিট হিসেবে কাজ করছে, যা স্বাধীন চলচ্চিত্রের বিতরণে বিশেষজ্ঞ। এই সংযোগের মাধ্যমে তারা বৃহত্তর বিতরণ নেটওয়ার্ক এবং আর্থিক সহায়তা পায়, যা ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পগুলোকে বাজারে আনার প্রক্রিয়াকে সহজ করে। MPI মিডিয়া গ্রুপের সমর্থন ওয়াটারমেলন পিকচার্সকে আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যাল ও থিয়েটার চেইনে প্রবেশের সুযোগ দেয়।
কোম্পানি সম্প্রতি নিজস্ব স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের উন্নয়নেও কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে প্যালেস্টাইনীয় ও অন্যান্য উপেক্ষিত গল্পগুলো সরাসরি দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তারা প্রচলিত বিতরণ চ্যানেল ছাড়িয়ে সরাসরি ভোক্তা ভিত্তি গড়ে তুলতে চায়। স্ট্রিমিং সেবা চালু হলে দর্শকরা সহজে এই ধরনের চলচ্চিত্রে অ্যাক্সেস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ওয়াটারমেলন পিকচার্সের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আরও বেশি সংখ্যক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র নির্মাতার সঙ্গে সহযোগিতা অন্তর্ভুক্ত। তারা নতুন দৃষ্টিকোণ ও কণ্ঠস্বরকে সমর্থন করে এমন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে ইচ্ছুক। এভাবে তারা বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্র সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে অবদান রাখতে চায়।
সামগ্রিকভাবে, ওয়াটারমেলন পিকচার্সের উদ্ভাবনী মডেল এবং সাহসী বিতরণ নীতি চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়ের প্রতি তাদের অটল দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কোম্পানিটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি অবহেলিত গল্পকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার জন্য তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
এইসব অর্জনের পেছনে রয়েছে দুই ভাইয়ের দৃঢ় সংকল্প এবং শিল্পের প্রতি অটল বিশ্বাস। ওয়াটারমেলন পিকচার্সের যাত্রা এখনো শেষ হয়নি; তারা নতুন প্রকল্প, নতুন কণ্ঠস্বর এবং নতুন দর্শকের সঙ্গে চলচ্চিত্রের শক্তিকে আরও বিস্তৃত করতে প্রস্তুত।



