স্পটিফাই তার চতুর্থ ত্রৈমাসিক আর্থিক ফলাফল উপস্থাপন করার সময় জানিয়েছে যে, কোম্পানির শীর্ষ ডেভেলপাররা ডিসেম্বর মাসের পর থেকে একটিও কোডের লাইন লিখেননি। এই তথ্যটি স্পটিফাইয়ের সহ-সিইও গাস্টাভ সডারস্ট্রোমের বক্তব্য থেকে এসেছে এবং এআই-চালিত উন্নয়ন প্রক্রিয়ার দ্রুতগতি তুলে ধরেছে। এভাবে কোম্পানি তার স্ট্রিমিং সেবার নতুন ফিচার ও আপডেটের গতি বাড়াতে চায়।
কোয়াটার কলের সময় সডারস্ট্রোম উল্লেখ করেন যে, স্পটিফাই একটি অভ্যন্তরীণ সিস্টেম “হঙ্ক” ব্যবহার করে কোডিং ও প্রোডাক্ট ডেলিভারির গতি ত্বরান্বিত করছে। হঙ্কের মাধ্যমে জেনারেটিভ এআই, বিশেষ করে ক্লড কোড, রিয়েল-টাইমে কোড ডিপ্লয়মেন্টের কাজ করে। ফলে ডেভেলপাররা দূর থেকে, মোবাইল ফোনে স্ল্যাকের মাধ্যমে সরাসরি এআইকে নির্দেশ দিতে পারে।
একটি বাস্তব উদাহরণে বলা হয়েছে, কোনো ইঞ্জিনিয়ার তার কাজের পথে স্ল্যাকের মাধ্যমে ক্লডকে জানিয়ে দেয় যে, iOS অ্যাপে একটি বাগ ঠিক করতে বা নতুন ফিচার যোগ করতে হবে। ক্লড দ্রুত সংশোধিত কোড তৈরি করে এবং স্ল্যাকের মাধ্যমে ইঞ্জিনিয়ারের ফোনে নতুন অ্যাপ ভার্সন পাঠায়। ইঞ্জিনিয়ার তাৎক্ষণিকভাবে প্রোডাকশনে মার্জ করতে পারে, অফিসে পৌঁছানোর আগেই কাজ শেষ হয়।
স্পটিফাই এই প্রক্রিয়াকে “অত্যন্ত দ্রুত” বলে উল্লেখ করেছে এবং ভবিষ্যতে এআই-চালিত ডেভেলপমেন্টের সম্ভাবনা আরও বাড়বে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। কোম্পানি বিশ্বাস করে যে, এআই এখনো শেষ পর্যায়ে পৌঁছায়নি, বরং নতুন উদ্ভাবনের সূচনা মাত্র। এই দৃষ্টিভঙ্গি শিল্পে এআই কোডিংকে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে উপস্থাপন করে।
২০২৫ সালে স্পটিফাই তার স্ট্রিমিং অ্যাপে ৫০টিরও বেশি নতুন ফিচার ও পরিবর্তন প্রকাশ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে “প্রম্পটেড প্লেলিস্ট”, অডিওবুকের জন্য “পেজ ম্যাচ” এবং “অ্যাবাউট দিস সঙ” নামের ফিচারগুলো চালু করা হয়েছে। এসব ফিচারই এআই প্রযুক্তির সরাসরি ফলাফল, যা ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা বাড়াতে সহায়তা করে।
প্রম্পটেড প্লেলিস্ট ব্যবহারকারীর মুড বা কার্যকলাপের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঙ্গীত সাজায়, আর পেজ ম্যাচ অডিওবুকের বিষয়বস্তুর সাথে মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট ট্র্যাক সুপারিশ করে। “অ্যাবাউট দিস সঙ” ফিচারটি গানের পেছনের তথ্য, শিল্পীর ব্যাকগ্রাউন্ড ও রেকর্ডিং বিবরণ সরবরাহ করে, যা শোনার সময় অতিরিক্ত প্রসঙ্গ যোগ করে। এই ফিচারগুলো স্পটিফাইকে প্রতিযোগীদের থেকে আলাদা করে এবং ব্যবহারকারীর সম্পৃক্ততা বাড়ায়।
স্পটিফাই উল্লেখ করেছে যে, এআই ব্যবহার করে তৈরি করা ডেটাসেটগুলো অন্য লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) দ্বারা সহজে কমোডিটাইজ করা যায় না। সঙ্গীত সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর প্রায়শই একাধিক সঠিক বিকল্প থাকে, যেমন ব্যায়াম সঙ্গীতের পছন্দ ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে হিপ-হপের জনপ্রিয়তা বেশি, তবে অন্যান্য অঞ্চলে ভিন্ন রুচি দেখা যায়।
এই ধরনের অনন্য ডেটা স্পটিফাইকে এআই মডেল প্রশিক্ষণে একটি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেয়, যা ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত পছন্দের সাথে আরও সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করতে সক্ষম। কোম্পানি দাবি করে যে, এই ডেটা সেটের গোপনীয়তা ও স্বকীয়তা বজায় রেখে তারা ভবিষ্যতে আরও সূক্ষ্ম এআই সেবা প্রদান করতে পারবে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা অনুমান করেন, এআই-চালিত কোডিং টুলের ব্যাপক গ্রহণ ডেভেলপারদের কাজের ধরণে মৌলিক পরিবর্তন আনবে। রুটিন বাগ ফিক্স ও ছোট ফিচার ডেভেলপমেন্ট স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে, ফলে মানব ডেভেলপাররা কৌশলগত পরিকল্পনা ও জটিল সমস্যার সমাধানে বেশি সময় দিতে পারবে। স্পটিফাইয়ের এই পদক্ষেপ শিল্পে এআইকে মূল উৎপাদন সরঞ্জাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
স্পটিফাইয়ের অভ্যন্তরীণ গবেষণা দল এআই অ্যালগরিদমের উন্নয়নে নিয়মিত আপডেট প্রদান করে এবং হঙ্ক সিস্টেমকে ক্রমাগত উন্নত করে। কোম্পানি ভবিষ্যতে ক্লডের পাশাপাশি অন্যান্য জেনারেটিভ মডেলকে একত্রিত করে আরও বিস্তৃত কোডিং সহায়তা প্রদান করার পরিকল্পনা করেছে। এভাবে ডেভেলপমেন্ট সাইকেলকে আরও সংক্ষিপ্ত করা এবং বাজারে দ্রুত নতুন ফিচার চালু করা সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, স্পটিফাইয়ের এআই-চালিত কোডিং পদ্ধতি কেবল ডেভেলপারদের কাজের চাপ কমাচ্ছে না, বরং সেবার গুণগত মান ও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতাও উন্নত করছে। কোম্পানি যে ৫০টিরও বেশি ফিচার ২০২৫ সালে প্রকাশ করেছে, তা এআইয়ের সরাসরি ফলাফল, এবং ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত এআই ইন্টিগ্রেশন প্রত্যাশিত। এভাবে স্পটিফাই সঙ্গীত স্ট্রিমিং শিল্পে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এআইকে মূল ব্যবসায়িক চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।



